Uncategorized

আমীন গারীবকে জিবরান

মে মাস ১৯০৩, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক ‘আলমুহাজের’ পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক আমীন গারীব বোস্টন শহর ভ্রমনে এসেছিলেন। আমীনকে স্বাগত জানাতে আসা যুবক কাহ্‌লিল জিবরান লোকজনের ভীড়ে সাংবাদিককে জড়িয়ে ধরে তার স্বভাবসুলভ স্থবিরতা, সুন্দর ব্যবহার এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বাগত জানালেন। পরবর্তিতে জিবরান গারীবকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জিবরান তাকে নিজের ছবিগুলো দেখিয়েছিলেন এবং একটি পুরাতন দিনলিপি উপহার দিয়েছিলেন যাতে তার চিন্তা ও ধ্যানের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ ছিল। আমীন তার ছবিগুলো দেখে এবং দিনলিপির কবিতাগুলো পড়তে পড়তে অনুধাবন করতে শুরু করলেন কত বড় সৃজনশীল কবি এবং দার্শনিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জিবরানের সবকিছু দেখে আমীন খুবই রোমাঞ্চিত হলেন, সাংবাদিক জিবরানকে তার দৈনিকে কলামিষ্ট হিসাবে কাজ করার আহ্বান জানালেন। এই আমীন গারীবই কাহ্লিল জিবরানকে বোস্টনের নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনলেন এবং আরবের পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। গারীব তার এক সম্পাদকীয়তে বলেছিলেন, “আরবি কথাসাহিত্যে একজন তরুণ চিত্রশিল্পীর প্রথম রচনার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে এই পত্রিকাটি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করছে যার চিত্রকলা আমেরিকার জনগণকে মুগ্ধ করেছে ; তিনি বীরত্বের জন্য বিখ্যাত নগরী বস্‌রির কাহ্‌লিল জিবরান। Tears and Laughter-এর এই রচনাটি আমরা ক্যাপশনে কোন উদ্ধৃতি ছাড়াই ছাপলাম। পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম, তারা তাদের মার্জিত রুচি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করবেন।” আর তখনই প্রথমবারের মতো জিবরান কোন আরবি দৈনিকে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখতে পেলেন। জিবরান যখন Spirits Rebellious নামে বইটি লিখলেন; যে বইতে তিনি Rose El Haines– এর গল্প বর্ণনা করেছেন যার জন্য জিবরান লেবানন থেকে বিতাড়িত হলেন এবং চার্চ তাকে ধর্ম থেকে বহিঃস্কার করল; বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন জিবরানের সেই বন্ধু আমীন গারীব। নিন্মোক্ত চিঠিতে দৃষ্টি গোচর করলে দেখা যাবে আমীনের জন্য জিবরানের ভালোবাসা কত গভীর ছিল। আমীন লেবাননে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জিবরান বন্ধুকে ভ্রমনের জন্য অভিবাদন জানালেন এবং বিশ্বাসী বন্ধুকে নিজের ভ্রমন পরিকল্পনা সম্পর্কেও জানালেন। আমীন গারীবকে জিবরান                                                                                                                                                                                                     বোস্টন,                                                                                                                                                                                         ফেব্রুয়ারি, ১৯০৮ প্রিয় আমীন, তোমাকে এমন একটি বিষয়ে বলতে যাচ্ছি, যা শুনলে তুমি এবং তোমার প্রতিবেশীরা খুশিই হবে; এ সম্পর্কে শুধু আমার ছোট বোন মারিনা কিছু কিছু জানে। আসছে বসন্তের শেষদিকে চিত্রকলার রাজধানী প্যারিসে যাচ্ছি, আশা করছি সেখানে একটি পুরোবছর থাকব। যে বারটি মাস আমি প্যারিসে থাকতে যাচ্ছি, আমার দৈনন্দিন জীবনে তা একটি বিরাট ভূমিকা পালন করবে। ঈশ্বরের দয়ায় যে সময়টা আমি এই আলোকোজ্জ্বল শহরে অতিবাহিত করতে যাচ্ছি তা আমার জীবনের গল্পে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমি এই মহান শহরের একদল মহান চিত্রকরের সাথে যোগ দেব এবং তাদের সান্নিধ্যে কাজ করব। আশা করছি তাদের তত্ত্ববধান এবং শিল্পকর্ম বিষয়ক গঠণমূলক সমালোচনা আমাকে লাভবান করবে। অবশ্য তারা আমাকে লাভবান করছে কি করছেনা এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ প্যারিস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর আমার চিত্রকর্মের কদর আরও বেড়ে যাবে যা অন্ধ ধনীদের ছবি কিনতে উৎসাহিত করবে। ছবিগুলোর কদর তাদের চিত্রশৈলীর কারণে নয় বরং এই কারণে বাড়বে যে, এগুলো এমন একজন শিল্পীর হাতে আঁকা যে কিনা মহান ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের সান্নিধ্যে প্যারিসে পুরো একটি বছর সময় কাটিয়েছেন।   আমি কখনও এমন ভ্রমনের স্বপ্নও দেখিনি এবং এ ধরনের চিন্তাও কখনও আমার মনে আসেনি। আমার মত মানুষের পক্ষে এ ধরনের ভ্রমনের ব্যায় বহন প্রায় অসম্ভব ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু স্বর্গ! আমার প্রিয় আমীন- স্বর্গ এই ভ্রমনের ব্যবস্থা করেছে, আমার নিজের অজান্তেই প্যারিসে যাওয়ার রাস্তা খুলে গেছে। আশা করছি স্বর্গের বিশালতায় থেকে জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র অতিক্রম করব।   ঠিক এই মুহূর্তে যখন তুমি আমার গল্প শুনছ- জেনে রেখো, বোস্টনকে ভালবাসি বলে এখানে থাকি ঠিক তা নয় আবার নিউইয়র্ক অপছন্দ করি বলেও নয়। আমি একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি মাথায় নিয়ে এখানে থাকি, যা আমাকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখায় এবং যা আমার অর্থনৈতিক মুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণের পথ তৈরী করছে। আমি প্যারিসে থাকি আর বোস্টনে থাকি ‘আলমুহাজের’র অগ্রগতি বাঁধাগ্রস্থ হবেনা। প্যারিস ভ্রমন আমার জন্য একটি বিশেষ সুযোগ এনে দিল সেই সব বিষয়ে লেখার যা এই যান্ত্রিক এবং বাণিজ্যিক দেশে আমি খুঁজে পাইনা বা ভাবতেও পারিনা, যার আকাশ সবসময় হইচই আর কলরবে পরিপূর্ণ। আমি বিশ্বের রাজধানীগুলোর রাজধানীতে বসে নিজেকে সামাজিক শিক্ষায় আলোকিত করব যেখানে একসময় রুশো, লেমার্টিন ও হুগো বাস করতেন এবং যেখানে আমেরিকানদের ডলারের প্রতি যেরকম ভালোবাসা অন্তত তার চেয়ে বেশী শিল্পের কদর রয়েছে।   তোমার অনুপস্থিতে ‘আলমুহাজেরে’র সকল সংখ্যাতেই লেখা পাঠানোর চেষ্টা করব। আমার হৃদয় ও মন-প্রাণ যা কিছু ধারণ করে তার সবকিছু নিংড়ে আমি এর পাতা ভরিয়ে তুলব। আমি কোন বিশেষ লাভের আশা বা লোভ করিনা, আমি তোমার কাছে শুধু বন্ধুত্ব্ চাই। অনেক নৈতিক বিতর্কের মাঝে যদি তুমি কোন বস্তুগত তর্ক সংযোজন করতে চাও তবে ক্ষমা চাই তোমার কাছে, তুমি তোমার সম্পাদনা কর্মীদের বলো, তারা যেন আমার Tears and Laughter বইটি ফেলে রাখে; তাদের বলো, তারা যেন এই বই লেখার সময় যে বহু ক্লান্তিবিহীন রাত ব্যায় করেছি তার ফসল ঘরে তুলতে সাহায্য করে। তুমি তাদের বলো, তারা যেন আরবি ভাষার পাঠক এবং নিউইয়র্ক ও (আমেরিকার) অন্যান্য রাজ্যের ধনীদের কাছে এই বইটি বিক্রি করার বিষয়ে আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে। তুমি জান, আলমুহাজের’র সহযোগিতা ছাড়া আমি এই বইটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবনা।   লেবাননের সৌন্দর্য্য উপভোগের সময় এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সময় মনে কোন সংশয়ের স্থান দিওনা, র্নিবিঘ্নে থেক। গত পাঁচ বছর তুমি অনেক পরিশ্রম করেছ, এখন একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। তোমার প্রশান্তির মাঝে ভবিষ্যৎ ভাবনাকে নাকগলাতে দিওনা। কি হবে তা নিয়ে ভেবনা, আলমুহাজের সকল আরবি পত্রিকার মাঝে মাথা উঁচু করে পথ চলবে। প্রতি সপ্তাহে তোমার একটি সংবাদ, আসাদ রুশতমের

আমীন গারীবকে জিবরান Read More »

বাবাকে জিবরান

বস্‌রি থেকে বাবাকে লেখা এই চিঠিখানিতে জিবরান তার দুইবোন মারিনা এবং সুলতানার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তাদের কোন এক আত্মীয় জিবরানের বাবাকে লিখেছিলেন, তার দুই মেয়ে খুবই অসুস্থ; বৃদ্ধ তার দুশ্চিšতার কথা ছেলেকে জানিয়েছিলেন। জিবরানের বাবা এই চিঠির তারিখ সম্পর্কে কিছু জানাননি। চিঠিখানি সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম দিকে অথবা এপ্রিল ফুল’র দিন লেখা। বাবাকে জিবরান                                                                                                                                                                                                     বৈরুত,                                                                                                                                                                                            এপ্রিল, ১৯০৪ প্রিয় বাবা, অপ্রত্যাশিত একটি সংবাদ পেয়ে গভীর দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে লেখা আপনার চিঠিখানি হাতে পেয়েছি। আমিও আপনার মত বেদনা বোধ করছি; কিন্তু এই চিঠি লেখার পেছনে লেখকের উদ্দেশ্য এবং চিঠির কারণ সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। তারা (ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন) আপনাকে চিঠিতে বলেছে আমার বোনদের একজন জটিল রোগে আক্রান্ত এবং তারা এও বলেছে, তার অসুখটি বড়সড় ব্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত। যে কারণে আমার বোনদের আপনাকে টাকা পাঠাতে সমস্যা হতে পারে। স¤প্রতি এই ভূতুড়ে চিঠির পেছনে আমি একটি কারণ খুঁজে পেয়েছি, চিঠিটি এপ্রিলের প্রথমদিন লেখা হয়েছিল। আমাদের খালামনি এ ধরণের ভদ্র এবং মজার রসিকতা করে অভ্যস্ত। তার ভাষ্যমতে আমাদের বোনদ্বয় গত ছ’মাস ধরে অসুস্থ; এটা কতটুকু সত্য তা তো শুনেই বোঝা যাচ্ছে। গত সাতমাসে মি. রয় আমাকে পাঁচটি চিঠি লিখেছেন, যাতে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আমার দুই বোন মারিনা ও সুলতানা দারুণ সুস্থ রয়েছে। তিনি তাদের সৎ চরিত্রের উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে সুলতানার মার্জিত ব্যবহার সম্পর্কে বলেছেন; তিনি বলেছেন আমাদের দু’জনের চেহারা, শারীরিক গঠন ও চরিত্রের দারুণ মিল রয়েছে। কথাগুলো আমাকে এমন একজন মানুষ বলেছেন যিনি আমার দেখা সবচে সৎ মানুষ। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি এপ্রিল ফুলের ঠাট্টা-তামাশা মারাত্মক ঘৃণা করেন এবং মানুষের হৃদয়ে দুঃখের সঞ্চার করে এমন বানোয়াট বিষয় অপছন্দ করেন। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি সবকিছু ঠিকঠাক আছে, আপনি আপনার মনকে শান্ত করুন।   আমি এখনও বৈরুতেই আছি। মনে হচ্ছে পুরোমাসটিই ঘরছাড়া থাকতে হবে। সেই আমেরিকান পরিবারকে অগাধ শ্রদ্ধা জানাই যাদের কল্যাণে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি সিরিয়া ও ফিলিস্তিন, যাদের কারণে মিশর এবং সুদান সফর আমার জন্য সহজ হল। যে কারণে আমি বলতে পারছিনা কবে আবার বৈরুত হতে ফিরছি। যাহোক, আমি আমার ব্যক্তিগত সুবিধার কথা চিন্তা করেই এখানে রয়ে গেছি যা আমাকে এই দেশে থাকতে সাহায্য করবে। আর তারা দু’জনেই আমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব ভাবে। আমার ভবিষ্যৎকে সুন্দর ও সুরক্ষিত করার জন্য কি করা প্রয়োজন এখন আমি তা সন্দেহাতীত আন্তরিকতার সাথে বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি।   আপনাকে যা বলার ছিল প্রায় সবই বলা হয়ে গেছে- আমার সব আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবকে গভীর ভালোবাসা জানাই। আর শ্রদ্ধা জানাই তাদেরকে যারা নিয়মিত আমার খোঁজ করে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি- তিনি যেন আপনাদের সুস্থ রাখেন এবং দীর্ঘায়ু করেন।                                                                                                                                                                                                  আপনার পুত্র                                                                                                                                                                                                      জিবরান

বাবাকে জিবরান Read More »