অনন্তের পথে

অনন্তের পথে

আলতাফ শেহাব

এক.
এ যেনো অনন্ত পথ হাঁটা। বাস, রিকশা শেষে সরু ক্ষেতের আল। তারপর চারপাশ জংলায় ভরা পায়ে চলার পথ পেরিয়ে উচু টিলার উপর সামান্য সমতলে তাঁর বাস। উঠানে একটা পুরোনো আমগাছের ছায়া, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কিছু ফলের গাছ। হোগলার বেড়ায় ঘেরা পাহাড়ি ছনের চালার ছোট্ট কুড়েঘর, দরোজায় কড়া নেই। চালার নিচেই এক পাশে বারান্দার মতো জায়গায় দু’চোখের ছোট্ট উনুন। একদিকে ভাত ফুটছে, অন্যপাশেরটায় ডাল।

উনুনের পাশে পিঁড়িতে বসে লাল মলাটের বই পড়ছেন ইয়াকুব আলী। পরনে সবুজ রঙের বাটিকের লুঙ্গি, গলায় লাল-সাদা চেকের গামছা জড়ানো। দূর থেকেই কাঁচা-পাকা দাঁড়ির আচ্ছাদন ভেদ করে প্রশান্ত চেহারা দিপ্তি ছড়াচ্ছে।

আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, হাঁসি দিয়ে কুশল বিনিময় শেষে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। শিতল পাটির পর্দা সরানো আগে আমি বুঝতেই পারিনি, এ ঘরে আলো বাতাস প্রবেশের এতো সুন্দর সুব্যবস্থা আছে। ঘরের চারপাশেই মেঝেতে থরে থরে বই সাজানো আছে। এককোনে মাটির কলসে পানি রাখা আছে, ঢাকনার উপর একটি স্টীলের গøাস উপুড় করে রাখা। আমাদের পানি খেতে বলে বেরিয়ে গেলন ইয়াকুব আলী। বিছানায় ছাড়ানো ছিটানো বইগুলো একপাশে রেখে বালিশে হেলান দিয়ে বসলাম।

বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি। বেলা এগারোটা, বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘরের ভেতরে তার ছিটেফোঁটাও টের পাওয়া যায় না। বিশাল আমগাছের শীতল ছায়া, আম পাতার ঝিরঝিরে বাতাস। শুনশান নিরবতা, মাঝে মাঝে দু’য়েকটা পাখির কলতান। আমগাছের মগডালে বহু পাখপাখালির আবাস। দূর আকাশের সীমানায় জ্বলজ্বল করছে কৃষ্ণচূড়ার লাল, রাধাচূড়ার সোনালী আভা।

বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ইয়াকুব আলী স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে আর নগরে ফিরে যাননি। তাঁর বর্তমান আস্তানাটি পৈত্রিক ভিটা না, বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত একটি বসতভিটা। প্রপিতামহদেরও আগের কোন পূর্বপুরুষের বসতি ছিল এখানে। নাগরিক কোলাহল থেকে দুরে, এই নির্জনতায় শোক উৎযাপন করছেন। কোলাহলে শোকের আয়ু কমে যায়।

আজ আমরা এসেছি মূলত: ভদ্রলোকের স্বেচ্ছা নির্বাসনের খবর সংগ্রহ করতে। কবি নাজিম হিকমত তার জেলখানার চিঠি কবিতায় লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকে আয়ু বড়জোর এক বছর। অধ্যাপক ইয়াকুব আলী কবির এই বাণীকে একেবারেই ভুল প্রমান করে বিগত পাঁচ বছর ধরে এই নির্জনবাসে আছেন।

পাঁচ বছর আগের এই দিনে গাছ কাটার বন্ধ করার দাবীতে সড়কে অবস্থানরত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অয়ন। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল ইয়াকুব ও রাশেদা দম্পত্তির একমাত্র সন্তান অয়ন আরিয়ান। রাজপথেই জীবনাবসান হয় অয়নের। উন্নয়নের নামে নগরের সড়ক বিভাজনের গাছ কাটার প্রতিবাদে, সহযোদ্ধাদের সাথে অবস্থান কর্মসূচী পালন করছিল অয়ন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও সময় পাওয়া যায়নি।

অয়নকে সমাধিস্থ করা হয় গ্রামের বাড়িতে, পারিবারিক গোরস্তানে। একমাত্র সন্তান হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেনি স্ত্রী রাশেদা আলী। সেই রাতেরই কোন এক সময়ে সকলের অগোচরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পাড়ি জমান পরোপারে। সন্তান হারানোর ব্যথা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্মৃতিতে অক্ষয় থাকে।


দুই.
রক্তে লিউকেমিয়া ধরা পড়ার আগে, কখনোই বোঝা যায়নি অয়ন ক্যানসারে আক্রান্ত। স্ত্রী রাশেদা আলীর সংসারে পিতা-পুত্র রাজার হালেই জীবন যাপন করেছেন। পরিপাটি সংসারে সবকিছুতেই সময় ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন রাশেদা। কিন্তু কোন কিছুতেই শেষ রক্ষা হলো না। বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র অয়ন বুঝতে পারলেন বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নিজের এই দূরাবস্থা ভাবিয়ে তোলে অয়নকে। বিশ্বজুড়ে তার মতো এমন হাজারো মানুষ ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যাতে তাদের কোন হাত নাই। কিছু মানুষের অতিরিক্ত লোভে পরিবেশের ভারসাম্য হীনতাই এসব সমস্যার মূল কারন। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে- বিষযুক্ত খাবার ও পরিবেশ দূষণ।

মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে, জীবনের অবশিষ্ট সময়গুলো ভিন্নভাবে যাপনের সিন্ধান্ত নেয় অয়ন। যোগাযোগ গড়ে তোলেন সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পারিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সাথে, যুক্ত করেন বন্ধুদেরও। বিশ্বের নানা প্রান্তে অয়নের মতো সচেতন মানুষেরা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে কথা বলছে। আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছে, বিশ্ব নেতাদের উদ্যোগি হতে বলছে। রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, সারা পৃথিবীর মানুষকে সর্তক করছে।

সন্তানের এমন অভূতপূর্ব সিন্ধান্তকে স্বাগত জানান ইয়াকুব আলী দম্পতি। ছেলের সাথে নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ হন রাজপথে। যতোটানা আন্দোলনের তাগিদে, তারচেয়ে বেশী অন্তিম সময়ে সন্তানের কাছাকাছি থাকার লোভে। ছেলের মরণ ব্যধি নিরাময়ের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে বহু চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেন। কেউই আশার বাণী শোনাতে পারেনি তাদের।

বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ধ্বংসের নানামুখী চক্রান্ত, জলবায়ু বিনষ্টের মানবতা বিরোধী সকল উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দেয় অয়ন। কিন্তু নিজের শরীরের রক্তে-অস্থিমজ্জায় ক্যান্সোরের জীবানু প্রতিরোধ করতে পারেনি। সন্তানের অনন্তের পথযাত্রায় সহযাত্রী হয়েছিলেন মা রাশেদা আলী। বাবকে একা রেখে মাতা-পুত্রের এই মহাযাত্রা মেনে নিতে পারেননি ইয়াকুব আলী। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয় না আর, স্ত্রী-পুত্রের যতোটা কাছে থাকা যায় এই নির্জনবাসে থেকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *