রাতের কফিন

রাতের কফিন

আলতাফ শেহাব

আজকাল অনেক হৈ-চৈ হট্টগোলের মধ্যেও হঠাৎ করে একা হয়ে যাওয়া যায়। বন্ধুদের তুমুল আড্ডার মাঝখান থেকেও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো হঠাৎ করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। মাঝে মাঝে নিজেকে সি.এন.জি চালিত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের মতো মনে হয়। নিরাপদ সাশ্রয়ী কিন্তু যে কোন সময়ে তুমুল বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুনিয়াকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানান দেয়া যায়। খুব সস্তায় শ্রম বিক্রি করি, কর্তা অনায়েসেই নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত হতে পারেন। নিজের বাজার দর যাচাই করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। খুবই হালকা মেজাজের সাধারণ মানের জীবন যাপন, ন্যূনতম বৈচিত্র নেই।

সস্তাদরের রোম্যান্টিসিজমে পেয়ে বসে মাঝে মধ্যে, ছকে বাঁধা জীবন-যাপনে এসব খুব কমই হয় বছরে… ছ’মাসে একবার…দু’বার। মধ্যরাতের নগর জীবনের স্বাদ নিতে হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। আজ হাঁটতে হাঁটতে রেল ষ্টেশনের দিকে গেলাম। প্রতিদিনের মতো একই জায়গায় যাদুর বাক্স নিয়ে বসে আছে যাদুমিয়া। লোকজন খুব একটা নেই। যাদুমিয়াও চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাদুমিয়ার সাথে কখনোই খুব একটা জমিয়ে উঠতে পারি না। নান রকম লোক ভুলানো কসরতের মতো খুব ব্যস্ত যাদুমিয়া নিজেও বন্ধি থাকে গন্ডিবদ্ধ যাদুর বাক্সে। কখনোই তেমন একটা পাত্তা দিতে চায়না। আজ একটু ব্যতিক্রম যাদুমিয়া, দেখেই চা-খাওয়ার আমন্ত্রন জানায়। সচরাচর কারো সাথে এমন আচরণ করে না যাদু মিয়া।

চা খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম- কি যাদুমিয়া আজ মনে হচ্ছে মনটা খুব ভাল?

যাদুমিয়ার অদ্ভুত রকমের উত্তর- বড়মিয়া আপনাদের চশমা পরা চোখ খুব টানে; কিন্তু ভয়ে কখনোই কাউকে বুঝতে দেই না।

জানতে চাইলাম- চশমার মতো এই সামান্য জিনিসটা কেন টানে আর ভয়ই কিসের?

যাদু মিয়ার সরল উত্তর- বড় মিয়া আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ! আপনাদেরকে কাছে টানলে ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে তাই আপনাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই। একসময় আপনাদের মতো চশমাপরা বুদ্ধিমান হওয়ার খুব শখ ছিল; বড্ড লোভ হতো।

অনেক ধরণের আলাপ আলোচনার মাঝে হঠাৎ যাদুমিয়ার খেয়াল হয় রাত বেড়ে চলছে। যাদুর বাক্স কাঁধে চাপাতে চাপাতে হেসে বলে, বড়মিয়া রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি যাদু মিয়ার পাশাপাশি হাটতে থাকি এ নিয়ে যাদুমিয়ার কোন উচ্চবাচ্চ নেই। রেলনাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে যাদু মিয়াকে নানা রকম প্রশ্ন করছি, উত্তর দিচ্ছে; পাল্টা প্রশ্ন করছে, উত্তর দিচ্ছি। কখনো কখনো হঠাৎ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ… কারো মুখে কোন কথা নেই। আমরা একটি গ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন ধরে হাঁটছি। ঘুটঘুটে অ›ন্ধকার, আশেপাশে তেমন কোন সাড়া শব্দ পওয়া যচ্ছে না। মাঝেমাঝে হঠাৎ করে মা হারা বকনা বাছুরের চিৎকারের মতো শিশুদের কান্নার শব্দে নিঝুম রাতের নিদ্রা ভঙ্গ হচ্ছে… আবার চুপ। একসময় যাদু মিয়াকে তার যাদুর বাক্স নিয়ে প্রশ্ন করি। যাদু মিয়া ক্ষেপে যায় কিন্তু হাসতে হাসতে বলে- বড়মিয়া এ কারণেই আপনাদের চশমাকে ভয় পাই। গরীবের পেটে লাত্থি দেয়ার দরকার নেই, আপনি আপনার পথে যান আমি আমার পথে যাই; রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরে যান একা যেতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না আমি জানি। আমি কথা না বাড়িয়ে যাদুমিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। যাদুমিয়া অনেকক্ষণ কোন কথা বলে না, চুপচাপ হাঁটে। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে হাতের টর্চটি জ্বেলে রাস্তা পরখ করে নেয়। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে, একটা বেফাস প্রশ্ন করে কেমন একা হয়ে গেলাম।

অনেক দূর যাওয়ার পর যাদুমিয়া মুখ খোলে; খুব হতাশ গলায় বলে- বড়মিয়া ধান্দার অবস্থা খুব খারাপ। যাদুমিয়ার যাদুতে এখন আর মানুষের পেট ভরে না। মানুষগুলো এখন কেমন হিংস্র হয়ে গেছে। ফোটকাটাই এখন রোজগারের একমাত্র আশ্রয়… ফোটকা না থাকলে এতদিনে না খেয়ে মরতে হতো। রক্ত-পুঁজের মাঝে দাঁড়িয়ে দিব্বি রোজগার করছি- খাচ্ছি- ঘুমাচ্ছি- সন্তান লালন পালন করছি। একটা জীবনকে কিভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছি শুধু মাত্র নিজেদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য… মানুষের খুব লোভ! মাঝেমাঝে নিজের প্রতি খুব ঘেন্না হয়; সন্তানদের দিকে তাকালেই মনে হয়Ñ এদের আমি কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছি… ক’দিন পর এদের প্রশ্নের কি জবাব দেব… বাঁচার জন্য কোথায় পালাব… কার কাছে আশ্রয় নেব।

আমার তখন ফোটকার কথা মনে হয়। যাদু মিয়া যাদুর বাক্সের পাশেই বসে থাকে ছেলেটা। ফোটকা মাছের মতোই পেটটা অদ্ভুত রকমের ফোলা, মাথাটা ছোট, হাড্ডিসার হাত-পা, চোখ দু’টো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। পেশাগত কারণে অনিবার্য ভাবেই গলাটা ফ্যাসফ্যাসে ভাঙ্গা। একদিন ফোটকার কসরৎ দেখছিলাম বসে, ভয়ের চেয়ে উল্টো কষ্টই বেশি পেয়েছিলাম। বুকটা চিন্ চিন্ করে ব্যথা করেছিল, দম বন্ধ করে অনেক কষ্টে কান্না চাপা দিয়েছিলাম।

ফোটকার কসরৎ বিশেষ কিছুই নয়, সে নির্বিঘ্নে সারাদিন টিউব লাইটের ভাঙ্গা টুকরো চিবিয়ে খেয়ে যায়। মাঝে মাঝে লোক সমাগম বাড়লে সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার ততোধিক দ্রæতার সাথে উঠে দাঁড়ায়, সবাইকে ছালাম জানায়। ফ্যাসফ্যাসে গলায় সবার কাছে হাত বাড়িয়ে টাকা চায়। ফোটকার এ সকল কসরৎ এর ফলেই যাদুমিয়ার বেশির ভাগ আয়-রোজগার হয়। কিন্তু যাদু মিয়া এসবে বিশেষ একটা সস্তি পায় না বারবার আশ্রয় খোঁজে ছুটে পালিয়ে যেতে চায় তার সোনালী অতীতের দিকে।

যাদু মিয়া ধীরে ধীরে বলে- বড়মিয়া ধান্ধার রকম সকম কত পাল্টে গেছে এখন! মানুষের জীবন ক্ষয় করে তিন বেলা খাবার জোগাড় হবে কিনা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি না। অথচ বাবা যখন এই যাদুর বাক্স হাতে দিয়ে পৃথিবী থেকে মুক্তি নিলেন; বেশ সুখেই তো দিন কাটছিল। খালি যাদুর বাক্সে তুড়ি মেরে কাগজের ফুল হাতে ধরিয়ে দিলে মানুষ খুশিতে পয়সা ছুড়ে মারতো… চোখ বন্ধ করে সুখের সাদা পায়রা উড়িয়ে দিয়ে পেটের জ্বালা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত… যুবকের বুকের কাছে সাদা রুমাল নাড়িয়ে দিয়ে ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে থাকা যেত…!

হঠাৎ খুব দ্রুতগামী একটা মালবোঝই ট্রাক বিকট গর্জনে আমাদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেল। যাদুমিয়া কোন কথা না বলে তার গ্রামের পথে হাঁটা ধরলেন। আমি বোকার মতো অদ্ভুত বোবা কান্না বুকে নিয়ে ব্রীজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম…। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল… ধীরে ধীরে আকাশ ফর্সা হতে লাগল। গ্রামের রমণীরা আধো আলো আঁধারিতে আলুথালু শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে নদীতে নামছে; রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সিক্ত বসনে লজ্বাবনত পায়ে আবার বাড়ী ফিরছে। দাঁড়িয়ে দেখছি… নববধুর মতো লাজুক লাল সাড়ী পরা সূর্যটা পুব আকাশে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর… দিন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে… আমি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম; সেই পথেই ষ্টেশনে ফিরে আসি। ষ্টেশন এখন বেশ জমজমাট। বড় হোটেলটির পাশে এসে দাঁড়ালাম। ফোটকা তার সেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে। একটি খুচরা পয়সার কৌটা নিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াচাড়া করছে। তার সেই বিদ্ঘুটে ফ্যাসফ্যাসে গলায় দোকানের একটি ছেলেকে ডাক দেয়। ছেলেটি প্রথমে তার ডাকে পাত্তা দেয় না পরে এক রকম বিরক্ত হয়েই ফোটকার কাছে আসে। ফোটকা গুনে গুনে কিছু খুচরো পয়সা ছেলেটির হাতে দিয়ে সিঙ্গারা দিতে বলে। কোটর থেকে বেড়িয়ে আসা সেই অদ্ভুত নিরুত্তাপ চোখে নির্বিকার তাকিয়ে থাকে রোদের দিকে… তার গায়ের বড় বড় ক্ষতগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছি ভাঙ্গা টিউব লাইট খেলে কি তাহলে মানুষের ক্ষিদে মরে না?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *