কথাসাহিত্য

রাতের কফিন

রাতের কফিন আলতাফ শেহাব আজকাল অনেক হৈ-চৈ হট্টগোলের মধ্যেও হঠাৎ করে একা হয়ে যাওয়া যায়। বন্ধুদের তুমুল আড্ডার মাঝখান থেকেও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো হঠাৎ করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। মাঝে মাঝে নিজেকে সি.এন.জি চালিত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের মতো মনে হয়। নিরাপদ সাশ্রয়ী কিন্তু যে কোন সময়ে তুমুল বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুনিয়াকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানান দেয়া যায়। খুব সস্তায় শ্রম বিক্রি করি, কর্তা অনায়েসেই নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত হতে পারেন। নিজের বাজার দর যাচাই করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। খুবই হালকা মেজাজের সাধারণ মানের জীবন যাপন, ন্যূনতম বৈচিত্র নেই। সস্তাদরের রোম্যান্টিসিজমে পেয়ে বসে মাঝে মধ্যে, ছকে বাঁধা জীবন-যাপনে এসব খুব কমই হয় বছরে… ছ’মাসে একবার…দু’বার। মধ্যরাতের নগর জীবনের স্বাদ নিতে হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। আজ হাঁটতে হাঁটতে রেল ষ্টেশনের দিকে গেলাম। প্রতিদিনের মতো একই জায়গায় যাদুর বাক্স নিয়ে বসে আছে যাদুমিয়া। লোকজন খুব একটা নেই। যাদুমিয়াও চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাদুমিয়ার সাথে কখনোই খুব একটা জমিয়ে উঠতে পারি না। নান রকম লোক ভুলানো কসরতের মতো খুব ব্যস্ত যাদুমিয়া নিজেও বন্ধি থাকে গন্ডিবদ্ধ যাদুর বাক্সে। কখনোই তেমন একটা পাত্তা দিতে চায়না। আজ একটু ব্যতিক্রম যাদুমিয়া, দেখেই চা-খাওয়ার আমন্ত্রন জানায়। সচরাচর কারো সাথে এমন আচরণ করে না যাদু মিয়া। চা খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম- কি যাদুমিয়া আজ মনে হচ্ছে মনটা খুব ভাল? যাদুমিয়ার অদ্ভুত রকমের উত্তর- বড়মিয়া আপনাদের চশমা পরা চোখ খুব টানে; কিন্তু ভয়ে কখনোই কাউকে বুঝতে দেই না। জানতে চাইলাম- চশমার মতো এই সামান্য জিনিসটা কেন টানে আর ভয়ই কিসের? যাদু মিয়ার সরল উত্তর- বড় মিয়া আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ! আপনাদেরকে কাছে টানলে ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে তাই আপনাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই। একসময় আপনাদের মতো চশমাপরা বুদ্ধিমান হওয়ার খুব শখ ছিল; বড্ড লোভ হতো। অনেক ধরণের আলাপ আলোচনার মাঝে হঠাৎ যাদুমিয়ার খেয়াল হয় রাত বেড়ে চলছে। যাদুর বাক্স কাঁধে চাপাতে চাপাতে হেসে বলে, বড়মিয়া রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি যাদু মিয়ার পাশাপাশি হাটতে থাকি এ নিয়ে যাদুমিয়ার কোন উচ্চবাচ্চ নেই। রেলনাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে যাদু মিয়াকে নানা রকম প্রশ্ন করছি, উত্তর দিচ্ছে; পাল্টা প্রশ্ন করছে, উত্তর দিচ্ছি। কখনো কখনো হঠাৎ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ… কারো মুখে কোন কথা নেই। আমরা একটি গ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন ধরে হাঁটছি। ঘুটঘুটে অ›ন্ধকার, আশেপাশে তেমন কোন সাড়া শব্দ পওয়া যচ্ছে না। মাঝেমাঝে হঠাৎ করে মা হারা বকনা বাছুরের চিৎকারের মতো শিশুদের কান্নার শব্দে নিঝুম রাতের নিদ্রা ভঙ্গ হচ্ছে… আবার চুপ। একসময় যাদু মিয়াকে তার যাদুর বাক্স নিয়ে প্রশ্ন করি। যাদু মিয়া ক্ষেপে যায় কিন্তু হাসতে হাসতে বলে- বড়মিয়া এ কারণেই আপনাদের চশমাকে ভয় পাই। গরীবের পেটে লাত্থি দেয়ার দরকার নেই, আপনি আপনার পথে যান আমি আমার পথে যাই; রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরে যান একা যেতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না আমি জানি। আমি কথা না বাড়িয়ে যাদুমিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। যাদুমিয়া অনেকক্ষণ কোন কথা বলে না, চুপচাপ হাঁটে। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে হাতের টর্চটি জ্বেলে রাস্তা পরখ করে নেয়। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে, একটা বেফাস প্রশ্ন করে কেমন একা হয়ে গেলাম। অনেক দূর যাওয়ার পর যাদুমিয়া মুখ খোলে; খুব হতাশ গলায় বলে- বড়মিয়া ধান্দার অবস্থা খুব খারাপ। যাদুমিয়ার যাদুতে এখন আর মানুষের পেট ভরে না। মানুষগুলো এখন কেমন হিংস্র হয়ে গেছে। ফোটকাটাই এখন রোজগারের একমাত্র আশ্রয়… ফোটকা না থাকলে এতদিনে না খেয়ে মরতে হতো। রক্ত-পুঁজের মাঝে দাঁড়িয়ে দিব্বি রোজগার করছি- খাচ্ছি- ঘুমাচ্ছি- সন্তান লালন পালন করছি। একটা জীবনকে কিভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছি শুধু মাত্র নিজেদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য… মানুষের খুব লোভ! মাঝেমাঝে নিজের প্রতি খুব ঘেন্না হয়; সন্তানদের দিকে তাকালেই মনে হয়Ñ এদের আমি কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছি… ক’দিন পর এদের প্রশ্নের কি জবাব দেব… বাঁচার জন্য কোথায় পালাব… কার কাছে আশ্রয় নেব। আমার তখন ফোটকার কথা মনে হয়। যাদু মিয়া যাদুর বাক্সের পাশেই বসে থাকে ছেলেটা। ফোটকা মাছের মতোই পেটটা অদ্ভুত রকমের ফোলা, মাথাটা ছোট, হাড্ডিসার হাত-পা, চোখ দু’টো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। পেশাগত কারণে অনিবার্য ভাবেই গলাটা ফ্যাসফ্যাসে ভাঙ্গা। একদিন ফোটকার কসরৎ দেখছিলাম বসে, ভয়ের চেয়ে উল্টো কষ্টই বেশি পেয়েছিলাম। বুকটা চিন্ চিন্ করে ব্যথা করেছিল, দম বন্ধ করে অনেক কষ্টে কান্না চাপা দিয়েছিলাম। ফোটকার কসরৎ বিশেষ কিছুই নয়, সে নির্বিঘ্নে সারাদিন টিউব লাইটের ভাঙ্গা টুকরো চিবিয়ে খেয়ে যায়। মাঝে মাঝে লোক সমাগম বাড়লে সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার ততোধিক দ্রæতার সাথে উঠে দাঁড়ায়, সবাইকে ছালাম জানায়। ফ্যাসফ্যাসে গলায় সবার কাছে হাত বাড়িয়ে টাকা চায়। ফোটকার এ সকল কসরৎ এর ফলেই যাদুমিয়ার বেশির ভাগ আয়-রোজগার হয়। কিন্তু যাদু মিয়া এসবে বিশেষ একটা সস্তি পায় না বারবার আশ্রয় খোঁজে ছুটে পালিয়ে যেতে চায় তার সোনালী অতীতের দিকে। যাদু মিয়া ধীরে ধীরে বলে- বড়মিয়া ধান্ধার রকম সকম কত পাল্টে গেছে এখন! মানুষের জীবন ক্ষয় করে তিন বেলা খাবার জোগাড় হবে কিনা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি না। অথচ বাবা যখন এই যাদুর বাক্স হাতে দিয়ে পৃথিবী থেকে মুক্তি নিলেন; বেশ সুখেই তো দিন কাটছিল। খালি যাদুর বাক্সে তুড়ি মেরে কাগজের ফুল হাতে ধরিয়ে দিলে মানুষ খুশিতে পয়সা ছুড়ে মারতো… চোখ বন্ধ করে সুখের সাদা পায়রা উড়িয়ে দিয়ে পেটের জ্বালা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত… যুবকের বুকের কাছে সাদা রুমাল নাড়িয়ে দিয়ে ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে থাকা যেত…! হঠাৎ খুব দ্রুতগামী একটা মালবোঝই ট্রাক বিকট গর্জনে আমাদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেল। যাদুমিয়া কোন কথা না বলে তার গ্রামের পথে হাঁটা ধরলেন। আমি বোকার মতো অদ্ভুত বোবা কান্না বুকে নিয়ে ব্রীজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম…। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল… ধীরে ধীরে আকাশ ফর্সা হতে লাগল। গ্রামের রমণীরা আধো আলো আঁধারিতে আলুথালু শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে নদীতে নামছে; রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সিক্ত বসনে লজ্বাবনত পায়ে আবার বাড়ী ফিরছে। দাঁড়িয়ে দেখছি… নববধুর মতো লাজুক লাল সাড়ী পরা সূর্যটা পুব আকাশে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর… দিন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে… আমি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম; সেই পথেই ষ্টেশনে ফিরে আসি। ষ্টেশন এখন বেশ জমজমাট। বড় হোটেলটির পাশে এসে দাঁড়ালাম। ফোটকা তার সেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে। একটি খুচরা পয়সার কৌটা নিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াচাড়া করছে। তার সেই বিদ্ঘুটে ফ্যাসফ্যাসে গলায় দোকানের একটি ছেলেকে ডাক দেয়। ছেলেটি প্রথমে তার ডাকে পাত্তা দেয় না পরে এক রকম বিরক্ত হয়েই ফোটকার কাছে আসে। ফোটকা গুনে গুনে কিছু খুচরো পয়সা ছেলেটির হাতে দিয়ে সিঙ্গারা দিতে বলে। কোটর থেকে বেড়িয়ে আসা সেই অদ্ভুত নিরুত্তাপ চোখে নির্বিকার তাকিয়ে থাকে রোদের দিকে… তার গায়ের বড় বড় ক্ষতগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছি ভাঙ্গা টিউব লাইট খেলে কি তাহলে মানুষের ক্ষিদে মরে না?

রাতের কফিন Read More »

অনন্তের পথে

অনন্তের পথে আলতাফ শেহাব এক.এ যেনো অনন্ত পথ হাঁটা। বাস, রিকশা শেষে সরু ক্ষেতের আল। তারপর চারপাশ জংলায় ভরা পায়ে চলার পথ পেরিয়ে উচু টিলার উপর সামান্য সমতলে তাঁর বাস। উঠানে একটা পুরোনো আমগাছের ছায়া, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কিছু ফলের গাছ। হোগলার বেড়ায় ঘেরা পাহাড়ি ছনের চালার ছোট্ট কুড়েঘর, দরোজায় কড়া নেই। চালার নিচেই এক পাশে বারান্দার মতো জায়গায় দু’চোখের ছোট্ট উনুন। একদিকে ভাত ফুটছে, অন্যপাশেরটায় ডাল। উনুনের পাশে পিঁড়িতে বসে লাল মলাটের বই পড়ছেন ইয়াকুব আলী। পরনে সবুজ রঙের বাটিকের লুঙ্গি, গলায় লাল-সাদা চেকের গামছা জড়ানো। দূর থেকেই কাঁচা-পাকা দাঁড়ির আচ্ছাদন ভেদ করে প্রশান্ত চেহারা দিপ্তি ছড়াচ্ছে। আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, হাঁসি দিয়ে কুশল বিনিময় শেষে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। শিতল পাটির পর্দা সরানো আগে আমি বুঝতেই পারিনি, এ ঘরে আলো বাতাস প্রবেশের এতো সুন্দর সুব্যবস্থা আছে। ঘরের চারপাশেই মেঝেতে থরে থরে বই সাজানো আছে। এককোনে মাটির কলসে পানি রাখা আছে, ঢাকনার উপর একটি স্টীলের গøাস উপুড় করে রাখা। আমাদের পানি খেতে বলে বেরিয়ে গেলন ইয়াকুব আলী। বিছানায় ছাড়ানো ছিটানো বইগুলো একপাশে রেখে বালিশে হেলান দিয়ে বসলাম। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি। বেলা এগারোটা, বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘরের ভেতরে তার ছিটেফোঁটাও টের পাওয়া যায় না। বিশাল আমগাছের শীতল ছায়া, আম পাতার ঝিরঝিরে বাতাস। শুনশান নিরবতা, মাঝে মাঝে দু’য়েকটা পাখির কলতান। আমগাছের মগডালে বহু পাখপাখালির আবাস। দূর আকাশের সীমানায় জ্বলজ্বল করছে কৃষ্ণচূড়ার লাল, রাধাচূড়ার সোনালী আভা। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ইয়াকুব আলী স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে আর নগরে ফিরে যাননি। তাঁর বর্তমান আস্তানাটি পৈত্রিক ভিটা না, বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত একটি বসতভিটা। প্রপিতামহদেরও আগের কোন পূর্বপুরুষের বসতি ছিল এখানে। নাগরিক কোলাহল থেকে দুরে, এই নির্জনতায় শোক উৎযাপন করছেন। কোলাহলে শোকের আয়ু কমে যায়। আজ আমরা এসেছি মূলত: ভদ্রলোকের স্বেচ্ছা নির্বাসনের খবর সংগ্রহ করতে। কবি নাজিম হিকমত তার জেলখানার চিঠি কবিতায় লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকে আয়ু বড়জোর এক বছর। অধ্যাপক ইয়াকুব আলী কবির এই বাণীকে একেবারেই ভুল প্রমান করে বিগত পাঁচ বছর ধরে এই নির্জনবাসে আছেন। পাঁচ বছর আগের এই দিনে গাছ কাটার বন্ধ করার দাবীতে সড়কে অবস্থানরত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অয়ন। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল ইয়াকুব ও রাশেদা দম্পত্তির একমাত্র সন্তান অয়ন আরিয়ান। রাজপথেই জীবনাবসান হয় অয়নের। উন্নয়নের নামে নগরের সড়ক বিভাজনের গাছ কাটার প্রতিবাদে, সহযোদ্ধাদের সাথে অবস্থান কর্মসূচী পালন করছিল অয়ন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও সময় পাওয়া যায়নি। অয়নকে সমাধিস্থ করা হয় গ্রামের বাড়িতে, পারিবারিক গোরস্তানে। একমাত্র সন্তান হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেনি স্ত্রী রাশেদা আলী। সেই রাতেরই কোন এক সময়ে সকলের অগোচরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পাড়ি জমান পরোপারে। সন্তান হারানোর ব্যথা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্মৃতিতে অক্ষয় থাকে। দুই.রক্তে লিউকেমিয়া ধরা পড়ার আগে, কখনোই বোঝা যায়নি অয়ন ক্যানসারে আক্রান্ত। স্ত্রী রাশেদা আলীর সংসারে পিতা-পুত্র রাজার হালেই জীবন যাপন করেছেন। পরিপাটি সংসারে সবকিছুতেই সময় ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন রাশেদা। কিন্তু কোন কিছুতেই শেষ রক্ষা হলো না। বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র অয়ন বুঝতে পারলেন বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নিজের এই দূরাবস্থা ভাবিয়ে তোলে অয়নকে। বিশ্বজুড়ে তার মতো এমন হাজারো মানুষ ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যাতে তাদের কোন হাত নাই। কিছু মানুষের অতিরিক্ত লোভে পরিবেশের ভারসাম্য হীনতাই এসব সমস্যার মূল কারন। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে- বিষযুক্ত খাবার ও পরিবেশ দূষণ। মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে, জীবনের অবশিষ্ট সময়গুলো ভিন্নভাবে যাপনের সিন্ধান্ত নেয় অয়ন। যোগাযোগ গড়ে তোলেন সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পারিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সাথে, যুক্ত করেন বন্ধুদেরও। বিশ্বের নানা প্রান্তে অয়নের মতো সচেতন মানুষেরা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে কথা বলছে। আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছে, বিশ্ব নেতাদের উদ্যোগি হতে বলছে। রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, সারা পৃথিবীর মানুষকে সর্তক করছে। সন্তানের এমন অভূতপূর্ব সিন্ধান্তকে স্বাগত জানান ইয়াকুব আলী দম্পতি। ছেলের সাথে নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ হন রাজপথে। যতোটানা আন্দোলনের তাগিদে, তারচেয়ে বেশী অন্তিম সময়ে সন্তানের কাছাকাছি থাকার লোভে। ছেলের মরণ ব্যধি নিরাময়ের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে বহু চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেন। কেউই আশার বাণী শোনাতে পারেনি তাদের। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ধ্বংসের নানামুখী চক্রান্ত, জলবায়ু বিনষ্টের মানবতা বিরোধী সকল উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দেয় অয়ন। কিন্তু নিজের শরীরের রক্তে-অস্থিমজ্জায় ক্যান্সোরের জীবানু প্রতিরোধ করতে পারেনি। সন্তানের অনন্তের পথযাত্রায় সহযাত্রী হয়েছিলেন মা রাশেদা আলী। বাবকে একা রেখে মাতা-পুত্রের এই মহাযাত্রা মেনে নিতে পারেননি ইয়াকুব আলী। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয় না আর, স্ত্রী-পুত্রের যতোটা কাছে থাকা যায় এই নির্জনবাসে থেকে।

অনন্তের পথে Read More »

খোরপোষ

খোরপোষ আলতাফ শেহাব সাতাশ বছর পর খোরপোষের মামলা দেখে প্রতিপক্ষের উকিলের মতো আপনাদের কেউ কেউও হয়তো হেঁসে উঠবেন। কিন্তু বিচারকের পক্ষে কি হেঁসে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব। সাতাশ বছর পূর্বে স্বামীর বাড়ী হতে দুই শিশুপুত্র সহ তাড়িয়ে দেওয়া হয় শবনমকে। স্বামী পরিত্যাক্তা শবনম যৌবনে মনে একপ্রকার ঘৃণা নিয়েই অনেক কিছু উপেক্ষা করেন। নানা রকম গঞ্জনা সহ্য করে বাবার বাড়িতে থিতু হন। এবাড়ি ওবাড়ি ঝি-গিরি করে বড় করে তোলেন দুই ছেলেকে। বড় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছেলেরা কেউই মানুষ হয়ে উঠেনি। মাদকাসক্ত বড় ছেলে দিনের বেশিরভাগই ঝুপড়ির ঘরে ঘুমিয়ে কাটায়, রাতভর নেশা করে প্রায়দিনই ভোরে বাড়ি ফেরে। শবনমের বাবা বেঁচে থাকতেই বাড়ির আঙিনার একপাশে ঝুপড়িটি করে দিয়েছিলেন যা ভাইদের দয়ায় এখনও টিকে আছে। রুগ্ন ছোট ছেলেটার কিস্তির টাকার টং দোকানের আয়ে কোনরকম টিকে আছে তিনজনের জীবন। না এখন আর ঝি-গিরি করার শক্তি নাই শরীরে। নিভুনিভু সংসারের বাতি যেকোন সময়ে নিভে যাবে দোকানের কিস্তি ফেল করলে। এখন আর ক্ষমতা না থাকলেও, চুরি ছেঁচড়ামি করে মেম্বার হয়ে এক সময় অনেক টাকা কামিয়েছে স্বামী মেরাজ সরদার। বাকি দুই পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের সাথেও সম্পর্ক ভালো না সরদারের। তিন তালাক বলে তাড়িয়ে দেয়ার পর সারা জীবনে একবারও যার মুখাপেক্ষী হয়নি শবনম, মনে প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়েও সাতাশ বছরের বঞ্চনার হিসাব কসতে হচ্ছে আজ তার সাথে। স্ত্রী হিসাবে দেনমোহর, নিজের ও সন্তানদের খোরপোষ সব মিলিয়ে বর্তমান বাজারে বেশ মোটা টাকার দাবি তুলেছে উকিল। মরার পরের চিন্তা নাই শবনমের, যেকোন ভাবে দাফনের ব্যবস্থা করবে লোকজন। কিন্তু যতক্ষণ বেঁচে আছে ভালোভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার নিশ্চয়তা চাই, চাই নিরাপদে শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার নিশ্চয়তা। বেশ্যার ঘরে জন্ম নিয়ে এনজিওর দয়ায় অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠা উকিল অনিমেষ এখন পিতৃ-পরিচয় জানে। কিন্তু সমাজের ঘৃণ্য এই লোকটার পরিচয়ে নিজেকে আর নোংরা করতে চায় না। অর্থলোভে নয় শবনমের মামলার মাধ্যমে যদি মেরাজ সরদারকে সর্বশান্ত করা যায়, তবেই মায়ের শেষ জীবনের চরম অর্থকষ্টের উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

খোরপোষ Read More »

সুধাময়

সুধাময় আলতাফ শেহাব সুধাময়ের মোহনীয় কণ্ঠসুধায় উথাল পাথাল মোহিনীদের বসার ঘরের পড়ন্ত বিকেল। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী মোহিনী কবিতার অন্তর্গত দৃশাবলী অনুবাদের সূত্র খোঁজেন উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের পরতে পরতে। শ্রেণীকক্ষে মেধাবী শিক্ষকের কাছে ছক কষে কবিতার ব্যাকরণ শেখা যায়, কিন্তু বসার ঘরে চায়ের আড্ডায় কবিকণ্ঠে কবিতার পাঠ মননে ও মগজে অন্যরকম ঝড় তোলে। মোহিনী ও সুধাময় একই কলেজে আলাদা বিষয়ে স্নাতকের ছাত্র, সময়ের হেরফেরে প্রতিদিন দেখা হয় না। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র সুধাময়ের ব্যস্ত সময় কাটে মিছিলে-স্লোগানে। সঙ্গত কারণে কলেজে বিশেষ কারো সাথে একান্তে সময় কাটানো হয়ে ওঠে না। দীঘির পাড়, মহাশ্মশান, পৌর উদ্যানে কবিতার রূপকল্প, ছন্দ, উপমার দুরন্ত পাঠ চলে অবিরত। অধ্যাপক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মোহিনীর সুধাময়ের সাথে এই অন্তরঙ্গ বোঝাপড়ার সঠিক নাম বা ব্যাকরণ জানে না দু’জনের কেউই। সুধাময় নিজের কবিতায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বের এই সম্পর্ককে শ্রেয়সী নামেই পরিচয় দেয়। স্নাতক শেষ হতে হতে দু’জনের দেখা সাক্ষাতের উপলক্ষও কমতে থাকে। শুরু হয় জীবনের অন্য আয়োজন। বাবা-মায়ের পরিকল্পনাতে হঠাৎ করে অনাড়ম্বরভাবেই বিয়ে হয়ে যায় মোহিনীর। অল্পদিনের ভেতর প্রবাসী স্বামীর সাথে পাড়ি জমায় অস্ট্রেলিয়া। আর পাকাপাকিভাবে কবিতার সাথে বসবাস শুরু হয় সুধাময়ের। এলোমেলো হয়ে যায় রাজনীতি, সমাজ, সংসার, হৃদয়ে সাথে বোঝাপড়ায় ছিন্নভিন্ন হয় বারংবার। মোহিনীর সাথে বিচ্ছেদ শ্রেয়সী হারানোর ব্যাথার চেয়েও বেশীকিছু মনে হয় সুধাময়ের। মধ্যবিত্ত সংসারের বড় সন্তান সুধাময়ের এ বিলাসিতা বেশি দিন চলবে কেন? অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষা শিখতে হয় রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র সুধাময়কে। বাবার পেনশনের টাকায় উচ্চ শিক্ষার নামে মূলত সংসারের ভাগ্য ফেরাতে বিলেতে পাড়ি দিতে হয় সুধাময়কে। বন্ধুর বিনামূল্যের আশ্রয় মাত্র ছয় দিনেই শেষ হয়। বিলেতের মোহ ভাঙ্গে যায় সুধাময়ের। শুরু হয় অন্য আলোর খোঁজ। সরকারি চাকুরে বাবার আশ্রয়ে থেকে বিকেলে চায়ের আড্ডায় সমাজ বদলের স্বপ্নদেখা সুধাময়ের কাছে এ এক অন্য জীবনের প্রতিচ্ছবি। বিদ্যার জোর কোন কাজেই আসে না, পায়ের জোরে দেশি খাবারের দোকানের প্রচারপত্র বিলি করে কোন কোন দিন দুই চার পাউন্ডের সংস্থান হয়। প্রচারপত্র বিলি করা নতুন বিষয় নয় সুধাময়ের কাছে, কিন্তু সাহেবদের বিলেতি কুকুরের তাড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন। হতাশ সুধাময় অল্প সময়ের মধ্যে বুঝে যান, এ সামান্য আয়ে সংসারের ভাগ্য ফেরাতো দূরের কথা নিজেরই টিকে থাকা অসম্ভব। পরিবারের স্বপ্নে জল ঢেলে ফেরার বিমানে চড়তে বাধ্য হয় সুধাময়। বিমান দেশের মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে শুরু হয় নতুন কবিতার চাষবাস। নিশ্চুপ আড়ালে চলে যায় সুধাময়। বছরের পর বছর স্মৃতি হাতড়ে মালা গাঁথে মোহিনীর প্রতিটি স্পর্শ বকুল। কিছুদিন আগে করোনা মহামারি শুরু হলে, ভয়ানক অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘরে ফিরে সকলে। অন্যদের বন্ধিদশা অনায়েশে খুন করে সুধাময়ের একাগ্র নির্জনতা। এবার ঘর ছাড়ে সুধাময়, পথেপথে খুঁজে ফিরে নির্জনতা। দেখা হয় মৃত্যুর মুখোমুখি অসহায় মানুষের নিদারুন একাকিত্বের সাথে। অন্য অনেককে শুশ্রষার সন্ধান দিতে দিতে মহামারীর কোন অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়,আর ফেরে না সুধাময়।

সুধাময় Read More »

শ্রাবণের জ্যোৎস্না

শ্রাবণের জ্যোৎস্না আলতাফ শেহাব মৃদুমন্দ বাতাস, অঝোরে ঝরছে রিমঝিম বৃষ্টি। জনালার ঘোলা কাঁচে অতিকায় চাঁদের ছায়া। থেকে থেকে শিশুদের কান্নার মতো অনাহারি কুকুরের অসহায় আর্তনাদ। ল্যাম্পোস্টের মৃদু আলোর নিচে বৃষ্টিভেজা জনশূন্য রাস্তায় নিঝুম রাতের নিরবতা। কিন্তু এখন মধ্যরাত নয়, মহানগরে রাতের প্রথম প্রহর মাত্র। হঠাৎ করেই এ ব্যস্ত নগরের সমস্ত কোলাহল গ্রাস করেছে করোনা মহামারি। কিছুক্ষণ আগে দু’জন পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে—শ্রাবণকে একটি সাদা ব্যাগে ভরে নিয়ে গেছে বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরিহিত চার জন স্বেচ্চাসেবকের একটি দল। জ্যোৎস্নাই ট্রিপল নাইনে কল করে কর্তৃপক্ষকে শ্রাবণের মৃত্যু সংবাদটি জানিয়েছিল। পুলিশ সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে জ্যোৎস্নার নিকট থেকে শ্রাবণের যাবতীয় তথ্য ও আইডি কার্ডের ছবি তুলে নিয়ে গেছে। পরিবারের কোন পুরুষ সদস্য উপস্থিত না থাকায়, স্বেচ্চসেবকরাই নিজ দায়িত্বে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করবে। শোকে হতবিহ্বল জ্যোৎস্না একবারের জন্যও কাউকে বুঝতে দেয় নাই, পাশের রুমেই বিছানায় খুব যত্ন করে শোয়ানো ছিল মৃত সন্তানের নিথর দেহ। সবাই চলে যাবার পর, নয় মাস বয়সি একমাত্র সন্তানের বরফ শীতল দেহটি বুকে আগলে জানলায় দাঁড়িয়ে আছে শোকে স্তব্ধ জ্যোৎস্না। দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রুধারা। এ এমনই এক ভয়াবহ সময়, প্রবল শোকেও পাশে কোন সমব্যথী নাই। সঙ্গহীন মানুষ। বাইরে পূর্ণ চাঁদের আলোয় বিগলিত জ্যোৎস্নার মতো নিরবে ঝরে পড়ছে শ্রাবণধারা। কয়েকদিন ধরে ধীরে ধীরে পচা তীব্র দুর্গন্ধে আশেপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠলে প্রতিবেশিদের টনক নড়ে, উদ্যোগি হন তারা। সপ্তাহখানেক পর এক নির্জন সকালে কয়েকজন প্রতিবেশির উপস্থিতিতে দরোজা ভাঙ্গা হয় শ্রাবণদের ফ্লাটের। বসার ঘরের ভেতর জানলার নিচে মেঝেতে পড়ে আছে দুটি অর্ধগলিত লাশ। বাড়িওয়ালা সনাক্ত করেন যুবতী মেয়েটি জ্যোৎস্না আর পাশে শিশুটি শ্রাবণ ও জ্যোৎস্নার নয় মাস বয়সি একমাত্র সন্তান প্রভাত।

শ্রাবণের জ্যোৎস্না Read More »

ফড়িং ও ঘুড়ি

ফড়িং ও ঘুড়ি আলতাফ শেহাব ছোটবেলায় ফড়িং ধারা ও ঘুড়ি উড়ানো এদু’টি বিষয়েই মায়ের কড়া নিষেধ ছিল। আমাদের দু’ভাইয়ের প্রায় প্রতিটি সকালই বেপোরোয়া হ’য়ে উঠতো ঘুড়ি উড়ানো অথবা ফড়িং ধরার নেশায়। একটি টকটকে লাল অথবা গাঢ় বেগুনী রঙের ফড়িঙের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে কতো সকাল মধ্যাহ্নের কড়া নেড়েছে তার হিসাব নেই। স্কুল ছুটির পর সহপাঠিরা যখোন পোশাক ছেড়ে খেয়েদেয়ে লাঠিম অথবা গুলতির আড্ডায় মশগুল আমরা তখনো একটি লাল ফড়িঙের পিছু ছুটছি। বাড়ীফিরে মায়ের তীব্র বকুনী কোনো আলাদা স্বাদ তৈরী করেনি কখনো। বরং সন্তর্পনে আমাদের দু’জোড়া চোখ খুঁজতে থাকতো মায়ের সেলাইয়ের সুতো। লাল ফড়িঙের ল্যাজে সাদা রঙের মিহি সুতো বেঁধে দিলেই হ’য়ে যেতো লাল ঘুড়ি। তারপর বাবা যেদিন বইয়ের মলাট বাঁধাইয়ের জন্য এনে দিলেন অনেকগুলো মোটা খাকি রঙের মলাট কাগজ সেদিনই হলো প্রকৃত প্রস্তাবে ফড়িঙের মুক্তি। ততোদিনে বন্ধুদের কাছে শিখে গেছি মলাট কাগজ ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সত্যিকারের ঘুড়ি বানানোর কৌশল।   আমাদের দু’ভাইয়ের কোনো লাটাই ছিলোনা, অবশ্য মাঞ্জাসুতার কথা জেনেছি অনেক পরে। সে বয়সে বই বাঁধাইয়ের সুতোই আমাদের কাছে সবচে সুলভ ছিলো। কারণ এগুলো টাকা দিয়ে কিনতে হয়নি কখনো। আমাদের দু’ভাইয়ের সেই একটি ঘুড়িই ছিলো ঘুড়ি উড়ানোর বয়সে; নিজ হাতে তৈরী। 

ফড়িং ও ঘুড়ি Read More »

ভ্রোমর ও কলি

ভ্রোমর ও কলি আলতাফ শেহাব হলুদ রঙের ঝুটিওয়ালা একটি কালো ভ্রোমর যে কতোরকম পুলক নিয়ে আসতে পারে স্কুল পলাতক কোন কিশোরের মনে; তা আমার চেয়ে আর কে বেশী জানবে? শীতের সকালে সকল আলস্যকে উপেক্ষা করে ছুটতাম আমরা কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ছাত্ররা। রাস্তার দুইধারে সাদা ভাটফুলের সুতীব্র গন্ধ ছুটতো আমাদের পিছু পিছু। আটবছর বয়সি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। নেশা বোঝা সে অনেক পরের ব্যাপার। হলুদ রঙের ঝুটিওয়ালা একটি কালো ভ্রোমর স্তব্দ ক’রে দিয়েছিল কুয়াশার চাদরমোড়া শীতের সকাল। জগতের সব সময়ের কাঁটাই থেমে গিয়েছিল কি এক অপরূপ নেশায়। আজো অনাবিষ্কৃত র’য়ে গেছে কী ছিল সেদিনের সেই কালো ভ্রোমরের গুঞ্জরণে। আমার সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। বাড়ী ফিরেছি দিয়াশলাইয়ের বাক্শোবন্দি কালো ভ্রোমরের গুনগুন্ কানে এবং তানে নিয়ে। আমাদের কালো ভ্রোমরদের প্রিয় ছিল যে ভাটফুল। যে ফুলের নেশা তাদের নিয়ে আসতো আমাদের মতো দুষ্ট বালকদের হাতের নাগালে। সে ফুলের মধু কোথায় ছিল তা জেনেছি অনেক পরে। তার তিক্তস্বাদ হাতে নিয়ে বাড়ী ফিরে খাওয়া-দাওয়া মাথায় উঠেছে কতোদিন। আমাদের সহপাঠি একমাত্র বালিকাটির হাতঘুরে যেদিন ভাটফুল বাড়ী পর্যন্ত সারারাস্তার সঙ্গী ছিলো; সেদিন জেনেছিলাম ফাটফুলের তীক্ত রসেও যে এক প্রকার মধু সঞ্চার হয় মানুষের মনে, গুঞ্জরিত হয় হাজার ভ্রোমরের গান।

ভ্রোমর ও কলি Read More »

ফিঙে ও শঙ্খচিল

ফিঙে ও শঙ্খচিল আলতাফ শেহাব সূর্য উঠার আগেই ঘর্মাক্ত শরীরে বিছানা ছাড়ি প্রতিদিন। বসন্তকাল, নরোম বাতাস, মাঠে বিশাল সবুজের সমারোহ। কৃষকরা আগাছা নিড়ানীতে ব্যস্ত। খেতের আলে ছড়িয়ে থাকা খুঁটিগুলোতে পুচ্ছ দুলাচ্ছে ফিঙেরা। সজাগ দৃষ্টি; ঠোঁটে ঘাস ফড়িঙের লালসা। আমরা দুষ্ট বালকের দল পতঙ্গফাঁদ নিয়ে প্রস্তুত। আমাদের ছোট ছোট চোখে শালিকের দৃপ্তি। ভোরের আলো প্রসারিত হওয়ার আগেই ধানের খেত ভরে ওঠে মা পাখিদের কলরবে। বাচ্চার আহার সংগ্রহে বেপরোয়া শালিকের দল। আমাদের মুগ্ধ চোখ মাঝেমাঝেই সতর্ক হ’য়ে ওঠে পতক্সগ ফাঁদের ঈশারার প্রতি। হঠাৎ পতক্সগফাঁদে আটকা পড়া একটি শিশু ফিঙের তীব্র চিৎকারে আমাদের ধ্যান ভাঙ্গে। ছুটে যাই তড়িৎ। ফাঁদের কাছাকাছি যেতেই কানের কাছে ঝপাঙ নেমে আসে বলিষ্ঠ ফিঙের ডানার সুতীব্র ঝাপট। ফিঙে দলপতির দূরন্ত সাহস আমাদের বিমূড় করে দেয়। থমকে যায় আমাদের সোনালী সকাল। ধীরে ধীরে যৌবনপ্রাপ্ত হয় সকাল। আকাশে নেমে আসে ক্ষুধার্ত শঙ্খচিলের দল। কাঁকড়া শিকারী শঙ্খচিলেরা সুতীব্র বেগে নেমে আসে নিচের দিকে; ছোবল মেরে নিমেশেই চ’লে যায় আকাশে। বিচিত্র রকমের এসব খেলায় মেতে উঠি আমরা। দু’টি দুরন্ত ফিঙের অসীম সাহস আমাদের মনোযোগকে আরেকবার টেনে নিয়ে যায় দিগন্তের ওপারে। ফিঙেদু’টি একের পর এক বেপরোয়া ডানার ঝাপটে দিশেহারা একটি শঙ্খচিল অসহায় ঘুরতে থাকে আকাশে আকাশে। অবাক বিস্ময় নেমে আসে আমাদের আকাশে। আমাদের চোখে স্থীর হ’য়ে থাকে দু’টি দুরন্ত ফিঙের কাছে একটি বলিষ্ঠ শঙ্খচিলের অসহায় আত্মসমর্পনের দৃশ্য।

ফিঙে ও শঙ্খচিল Read More »

পাতা ও ধূলি

পাতা ও ধূলি আলতাফ শেহাব একদিন বিপন্ন দুপুরবেলা আমাদের উঠানে ধূলিঝড়ের সে এক বিস্ময়কর অপরূপ খেলা। কতোরকম শুকনো পাতার বিচিত্র নাচন। তারা কাকে যেনো ঘিরিয়া ঘিরিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচে আর সুতীব্র বেগে দূরে চ’লে যায় অজানার পথে। আমরা তাদের পিছু পিছু ছুটে বেড়াই। এ বিচিত্র খেলার সঙ্গি হ’তে চাই। কিন্তু আমাদের হতবাক ক’রে তারা যেনো কোন সুদূরে মিলিয়ে যায়। বাতাসের সুতীব্র দাপট আমাদের ঠেলে নিয়ে যায় ঘরের চৌকাঠে দরোজার কোনে। আমাদের শিশুহাতের যত্নে বেড়ে ওঠা পুঁই লতাটির পাতায় পাতায় বাতাস আর ধূলিদের সেকি আমোদ-উল্লাস। প্রিয় পুঁই পাতারা সুপক্ক শিমুলের তুলা আর মেহগনি বীজপত্রদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাতাসের সাথে নৃত্যরত। শিমুলের তুলারা মেঘেদের মতো ভেসে বেড়ায় বাতাসে বাতাসে। মেহগনি বীজপত্ররা ছড়িয়ে পড়ে মাঠে প্রান্তরে। অসহায় ধূলিরা পুঁই পাতাদের শরীরে মাখামাখি হ’য়ে বাতাসের সুতীব্র দাপটে জমিনে গড়াগড়ি যায়। এভাবেই ঘনকালো মেঘেরা বর্ষণ হ’য়ে নেমে আসে ধরণীতে। থমকে যায় বাতাসের তান্ডব। আর আমাদের প্রিয় পুঁই পাতারা ধাতস্থ হ‘য়ে ওঠার আগেই ধূলি আর বৃষ্টির জলে গড়াগড়ি যায়। অবিরাম বর্ষণক্লান্ত আকাশ যখোন পূর্ণবার সূর্যের সঙ্গি হয় দিনের আলোয়; আমাদের প্রিয় পুঁই পাতাদের সর্বাঙ্গে ধূলিদের সেকি অপরূপ উজ্জ্বল দৃপ্তি। তারপর বহু দুপুর গত হ’য়ে গেছে আমাদের জীবনে। বহু দাম্পত্য দুপুর ফলবতি হয়েছে কোথাও কোথাও। আমাদের প্রিয় পুঁই পাতা আর ধূলিদের সেই অপূর্ব রমণদৃশ্যটি তার নিজস্ব দৃপ্তিতে আজো উজ্জ্বল স্বমহিমায়।

পাতা ও ধূলি Read More »