কাহ্লিল জিবরানের চিঠি
আত্মপ্রতিকৃতি
(A Self Portrait)
ভাষান্তরঃ আলতাফ শেহাব
কাহ্লিল জিবরান(১৮৮৩-১৯৩১), লেবানিজ-আমেরিকান দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক, আধ্যাত্মিক কবি ও চিত্রশিল্পী। জিবরানের সর্বাধিক জনপ্রিয় বই The Prophet, আংশিক আত্মজীবনীমূলক ২৬ টি কাব্যিক রচনার সমন্বয়ে রচিত এই বইটি ২০টিরও বেশী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ১৯২০’র দশকে বইটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের গৌরব অর্জন করেছিল। ১৯৬০’র দশকে The Prophet প্রতিশিল্পের পথ প্রদর্শক হয়ে সমনে হাজির হল। জিবরানের বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মকাণ্ড সে সময় আমেরিকার সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। জিবরান বিশ্বাস করতেন চিন্তা ও যাপনের একটি সুস্থ বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন উপায় নিশ্চয় পাওয়া যাবে, যা দ্বারা মানুষ নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।
“মানুষের হৃদয় সাহায্যের জন্য কাঁদে, মানুষের মন মুক্তির জন্য প্রার্থনা করে। কিন্তু আমরা তাদের কান্না অনুধাবন করতে পারিনা; শুনিওনা, বুঝিওনা। আর যে শোনে এবং বোঝে আমরা তাকে পাগল বলি। তার কাছথেকে পালিয়ে বেড়াই।”
কাহ্লিল জিবরান ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি লেবাননের বস্রিতে একটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত পাহাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। খুব অল্প বয়সে মেধাবী শিশু জিবরান আঁকাআঁকি ও লেখালেখি শুরু করেন। জিবরানের মা কামিলা রাহ্মি তার সন্তানদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান, তাদের বাবা ওয়ালনাট বাগানের মালিক কাহ্লিল লেবাননেই থেকে যান। জিবরানদের পরিবার প্রথমে বোস্টনে বসবাস শুরু করে, সেখানে তার মা লাইনেন ও ফিতা বিক্রি করে জিবিকা নির্বাহ করতেন। একবছরের মধ্যেই তিনি পর্যাপ্ত টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন যা দিয়ে ছেলে পিটারকে শুকনো মালপত্রের দোকান খুলতে সাহায্য করেছিলেন।
১৮৯৮ সালে বৈরুতের আল-হিকমা কলেজে আরবি সাহিত্যে পড়ালেখা করার উদ্দেশ্যে জিবরান দুই বছরের জন্য লেবাননে ফিরে আসেন। জিবরানের শিল্পীসত্ত্বা বিকশিত হতে থাকল এবং আলোকচিত্রী এফ. হল্যান্ড ডে’র সাথে পরিচয় হল। জিবরান তার কছে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে দীক্ষা নিলেন। এরই মধ্যে জিবরান বোস্টন সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করলেন, সেখানে তার সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের সাথে যোগাযোগ হল। ২০ বছর বয়সে মা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বোন মারিনা পরবর্তীতে তাকে একজন চিত্রশিল্পী ও লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেন। সারাজীবন জিবরানকে সবচে বেশী সহযোগিতা করেছিলেন ক্যাম্ব্রিজের একটি প্রগতিশীল বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মেরী হ্যাস্কিল। তিনি জিবরানের সকল ইংরেজী বইয়ের সম্পাদনা করতেন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিকভাবেও সহযোগিতা করতেন।
১৯০৪ সালে বোস্টনে জিবরানের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। তার প্রথম বই Al-Musiqa(১৯০৫) সঙ্গীত বিষয়ে লেখা। ১৯১২ সালে এই বইয়ের অনুকরণে ছোটগল্প ও উপন্যাসিকার দুইটি সংকলন বের হয়। ১৯০৮ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত অগাস্ট রোডিনের সাথে প্যারিসে চিত্রকলা বিষয়ে পড়ালেখা করেন। ১৯১২ সালে লেখালেখি ও ছবি আঁকার স্বার্থে নিউইয়র্কে স্থায়ী হন, তার বইতে অতিমানবীয় বিষয়াবলী সংশ্লিষ্ট হয়, জিবরানের ছবির মূল বিষয়বস্তু পরষ্পর সংলগ্ন মানুষের নগ্ন শরীরের কোমল রূপ।
জিবরান লেখালেখি শুরু করেছিলেন আরবিতে, আধুনিক আরবি সহিত্যের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি লেবানিজ এবং আরবি ভাষাভাষী লোকজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে লিখেছিলেন। ১৯১৮ সাল থেকে মূলতঃ ইংরেজীতে লেখা শুরু করেন এবং ১৯২০ ও ১৯৩০ দশকের কবিতার ভাষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। Alfred Knopf প্রকাশনী হতে প্রকাশিত প্রথম বই The Madman(১৯১৮), গল্প ও কবিতার মাঝামাঝি- বাইবেলের ছন্দে লেখা স্বতঃসিদ্ধ প্রবাদ ও নীতিগল্পের একটি ছোটখাটো সংকলন।
জিবরান তার মাতৃভূমি এবং মানবতার জন্য হুমকি শয়তানকে প্রতিহত করার জন্য মহাপুরুষোচিত স্বর ব্যবহার করতেন। আধ্যাত্মিকতা ও সুন্দরের সমন্বয়ে গঠিত তার বিচিত্র এই প্রকাশভঙ্গি পরবর্তীতে ‘জিবরানইজম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
“আমি আমার নিজের কাছে অচেনা। আমি আমার ঠোঁটকে বলতে শুনি কিন্তু কানের কাছে তা অচেনা ঠেকে। মনে হয় দেখছি, আমারই এক লুকানো সত্ত্বা হাসছে, কাঁদছে, বিচিত্র দুঃখবোধ; এসব কারণে নিজেকে দেখে নিজেই বিমোহিত হই এবং এইবোধরা আমার মনের কাছে ব্যখ্যা চেয়ে প্রশ্ন করে। কিন্তু আমি অজানা, গোপন, কুয়াশা আবৃত নৈঃশব্দের ভেতর চলে যাই। (‘The Poet’ থেকে)
১৯২০ সালে জিবরান আরব লেখকদের জন্য ‘Aribitah(pen bond)’ নামে একটি সংগঠন গঠন করার মাধ্যমে প্রাচীন রক্ষণশীল আরবি সাহিত্যে বিপ্লবের হাতকে শক্তিশালী করেন। নতুন চিন্তাকে প্রকাশ করার শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে আর্ভিভূত, নিউইয়র্কে প্রকাশিত প্রথম আরবি দৈনিক Al Magar; জিবরান এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন।
জিবরান সৃজনশীলতার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছিলেন; যদিও তিনি কাব্য সাহিত্যের বিশাল কোন কবি ছিলেননা, গদ্যের মত করে লেখা তার বেশীরভাগ রচনাকে কবিতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। নিজস্ব চিত্রকর্মের মাধ্যমে নিজের একটি বইয়ে অলংকরণও করেছিলেন।
অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে পাকস্থলীতে রোগাক্রান্ত হয়ে ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র ৪৮ বছর বয়সে নিউইয়র্কে এই মহান দার্শনিক, চিত্রশিল্পী ও কবির জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পর এই মহান শিল্পীকে তার জন্মভূমি লেবাননে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে সমাধীর পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয় জিবরান মিউজিয়াম। জিবরান তার সকল বইয়ের র্যয়েলেটি নিজগ্রামের নামে উইল করে যান।
“যখন আত্মারা তাদের
আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়, আমার হৃদয়
দুঃখের অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
রাত্রি! আমি তোমারই মত। যখন সকাল আসে
তখন আমার সময় নিঃশেষ হতে থাকে।”
জিবরানের মৃত্যুর প্রায় ২৮ বছর পর ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হলো A Self Portrait (আত্মপ্রতিকৃতি)। জিবরান সারা জীবন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে বহু চিঠি লিখেছেন। এই বইটি মূলতঃ জিবরানের লেখা সেইসব চিঠির একটি সংকলন। প্রায় সবগুলো চিঠিরই সংক্ষিপ্ত ভূমিকা সংযোজিত আছে; যার ফলে প্রাপকের সাথে লেখকের সম্পর্কের ধরণ, চিঠিটি লেখার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। চিঠিগুলো পড়ে খুব সহজেই জিবরানের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ছোঁয়া যায়; নিবীড়ভাবে উপলব্ধি করা যায় জিবরান ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় কি পরিমান দায়ীত্বশীল ছিলেন।
-আলতাফ শেহাব
- All Posts
- অনুবাদ
- কথাসাহিত্য
- কবিতা
- প্রকাশিত বই
- সম্পাদনা
- Back
- অনুগল্প
- ছোটগল্প
- মুক্তগদ্য

মে মাস ১৯০৩, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক ‘আলমুহাজের’ পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক আমীন গারীব বোস্টন শহর ভ্রমনে এসেছিলেন। আমীনকে...

বস্রি থেকে বাবাকে লেখা এই চিঠিখানিতে জিবরান তার দুইবোন মারিনা এবং সুলতানার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তাদের কোন...

