আলতাফ শেহাব

শ্রাবণের জ্যোৎস্না

শ্রাবণের জ্যোৎস্না আলতাফ শেহাব মৃদুমন্দ বাতাস, অঝোরে ঝরছে রিমঝিম বৃষ্টি। জনালার ঘোলা কাঁচে অতিকায় চাঁদের ছায়া। থেকে থেকে শিশুদের কান্নার মতো অনাহারি কুকুরের অসহায় আর্তনাদ। ল্যাম্পোস্টের মৃদু আলোর নিচে বৃষ্টিভেজা জনশূন্য রাস্তায় নিঝুম রাতের নিরবতা। কিন্তু এখন মধ্যরাত নয়, মহানগরে রাতের প্রথম প্রহর মাত্র। হঠাৎ করেই এ ব্যস্ত নগরের সমস্ত কোলাহল গ্রাস করেছে করোনা মহামারি। কিছুক্ষণ আগে দু’জন পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে—শ্রাবণকে একটি সাদা ব্যাগে ভরে নিয়ে গেছে বিশেষ সুরক্ষা পোশাক পরিহিত চার জন স্বেচ্চাসেবকের একটি দল। জ্যোৎস্নাই ট্রিপল নাইনে কল করে কর্তৃপক্ষকে শ্রাবণের মৃত্যু সংবাদটি জানিয়েছিল। পুলিশ সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে জ্যোৎস্নার নিকট থেকে শ্রাবণের যাবতীয় তথ্য ও আইডি কার্ডের ছবি তুলে নিয়ে গেছে। পরিবারের কোন পুরুষ সদস্য উপস্থিত না থাকায়, স্বেচ্চসেবকরাই নিজ দায়িত্বে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করবে। শোকে হতবিহ্বল জ্যোৎস্না একবারের জন্যও কাউকে বুঝতে দেয় নাই, পাশের রুমেই বিছানায় খুব যত্ন করে শোয়ানো ছিল মৃত সন্তানের নিথর দেহ। সবাই চলে যাবার পর, নয় মাস বয়সি একমাত্র সন্তানের বরফ শীতল দেহটি বুকে আগলে জানলায় দাঁড়িয়ে আছে শোকে স্তব্ধ জ্যোৎস্না। দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছে অশ্রুধারা। এ এমনই এক ভয়াবহ সময়, প্রবল শোকেও পাশে কোন সমব্যথী নাই। সঙ্গহীন মানুষ। বাইরে পূর্ণ চাঁদের আলোয় বিগলিত জ্যোৎস্নার মতো নিরবে ঝরে পড়ছে শ্রাবণধারা। কয়েকদিন ধরে ধীরে ধীরে পচা তীব্র দুর্গন্ধে আশেপাশের বাতাস ভারি হয়ে উঠলে প্রতিবেশিদের টনক নড়ে, উদ্যোগি হন তারা। সপ্তাহখানেক পর এক নির্জন সকালে কয়েকজন প্রতিবেশির উপস্থিতিতে দরোজা ভাঙ্গা হয় শ্রাবণদের ফ্লাটের। বসার ঘরের ভেতর জানলার নিচে মেঝেতে পড়ে আছে দুটি অর্ধগলিত লাশ। বাড়িওয়ালা সনাক্ত করেন যুবতী মেয়েটি জ্যোৎস্না আর পাশে শিশুটি শ্রাবণ ও জ্যোৎস্নার নয় মাস বয়সি একমাত্র সন্তান প্রভাত।

শ্রাবণের জ্যোৎস্না Read More »

কবিতায় লিখব খুনের বয়ান

কবিতায় লিখব খুনের বয়ান আলতাফ শেহাব জলপাই সবুজে জড়োসড়ো প্রতিটি রাজপথনগরে এমন শ্রাবণ আমরা চাইনি।সাজোয়া ট্যাংকের পিঠে উদ্ধত রাইফেল হাতেপথরোধ করে দাঁড়িয়ে থাকবে প্রহরিএতো বিমর্ষ নিরাপত্তা আমরা চাইনি। বাবার কোলে গুলিবিদ্ধ শিশু রিয়া গোপসন্তানহারা চোখে আজন্ম শোক চাইনি।ঝাঁজাল কাঁদানেগ্যাস রুখতে গিয়েজনালার শার্শিতে গুলিবিদ্ধ হলোকিশোর সামির, চোখের মনি ভেদ করেমাথার খুলি ভেঙ্গে দিল ঘাতক বুলেট,তাঁর মায়ের আজন্ম শূন্যদৃষ্টি চাইনি।প্রকাশ্যে রাস্তায় খুন হলো আবু সাইদসরাসরি বুকে গুলি করে দিলো বাহিনী।চোখেমুখে হাঁসতো ছেলেটা মীর মুগ্ধআমাদেরই অর্থে কেনা বুলেটে স্তব্ধ।আছে এমন আরো শতশত খুনের বিবরণকটা মুছবে রাষ্ট্রীয় শোকের কালো প্রহসন? নিরাপত্তা ভিক্ষা চাইছে নিরাপত্তা বাহিনীলাশের মিছিলে শামিল হচ্ছে ইউনিফর্মবিনা প্রতিরোধে ভেঙ্গে যাচ্ছে কারাগারআমার বুকে তাক করে রাখা দেহরক্ষীর বন্দুকরক্তস্রোতে উপচে পড়ছে নালা-নর্দমার বুকজনতার মুখোমুখি লোভী রাজনৈতিকের মুখলাশ কাটা ঘরে অগণিত লাশ পরিচয়হীনছাই হয়ে গেছে অন্তর্জাল যদিও তারহীনদিনের পর দিন বিভৎস সান্ধ্য আইনদিনের আলোয় সব দাবি মেনে নিবে ঠিকঅন্ধকার ঘনীভূত হলে দরোজায় ঠক ঠকরাষ্ট্রের সকল সান্ত্রী নির্ঘুম রুখে দিতে জনতাএ কোন প্রেতছায়া, কারা জনপদের ক্ষমতা। আলমত নষ্ট করবে, ফাঁসিয়ে দেবে সহযোদ্ধাদেরপ্রয়োগ করবে- মুছে দেয়ার আছে যতো কৌশলএজহারে বিবরণ লিখবে তোমাদের মতো ছলে!প্রতিটি সুরভিত নগর উদ্যানে জড়ো হবো আমরাঢেকে দিব যতো কোলাহল সব মিছিলে মিছিলেকবিতায় লিখব খুনের বয়ান দেয়ালে দেয়ালে।

কবিতায় লিখব খুনের বয়ান Read More »

ফড়িং ও ঘুড়ি

ফড়িং ও ঘুড়ি আলতাফ শেহাব ছোটবেলায় ফড়িং ধারা ও ঘুড়ি উড়ানো এদু’টি বিষয়েই মায়ের কড়া নিষেধ ছিল। আমাদের দু’ভাইয়ের প্রায় প্রতিটি সকালই বেপোরোয়া হ’য়ে উঠতো ঘুড়ি উড়ানো অথবা ফড়িং ধরার নেশায়। একটি টকটকে লাল অথবা গাঢ় বেগুনী রঙের ফড়িঙের পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে কতো সকাল মধ্যাহ্নের কড়া নেড়েছে তার হিসাব নেই। স্কুল ছুটির পর সহপাঠিরা যখোন পোশাক ছেড়ে খেয়েদেয়ে লাঠিম অথবা গুলতির আড্ডায় মশগুল আমরা তখনো একটি লাল ফড়িঙের পিছু ছুটছি। বাড়ীফিরে মায়ের তীব্র বকুনী কোনো আলাদা স্বাদ তৈরী করেনি কখনো। বরং সন্তর্পনে আমাদের দু’জোড়া চোখ খুঁজতে থাকতো মায়ের সেলাইয়ের সুতো। লাল ফড়িঙের ল্যাজে সাদা রঙের মিহি সুতো বেঁধে দিলেই হ’য়ে যেতো লাল ঘুড়ি। তারপর বাবা যেদিন বইয়ের মলাট বাঁধাইয়ের জন্য এনে দিলেন অনেকগুলো মোটা খাকি রঙের মলাট কাগজ সেদিনই হলো প্রকৃত প্রস্তাবে ফড়িঙের মুক্তি। ততোদিনে বন্ধুদের কাছে শিখে গেছি মলাট কাগজ ও বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সত্যিকারের ঘুড়ি বানানোর কৌশল।   আমাদের দু’ভাইয়ের কোনো লাটাই ছিলোনা, অবশ্য মাঞ্জাসুতার কথা জেনেছি অনেক পরে। সে বয়সে বই বাঁধাইয়ের সুতোই আমাদের কাছে সবচে সুলভ ছিলো। কারণ এগুলো টাকা দিয়ে কিনতে হয়নি কখনো। আমাদের দু’ভাইয়ের সেই একটি ঘুড়িই ছিলো ঘুড়ি উড়ানোর বয়সে; নিজ হাতে তৈরী। 

ফড়িং ও ঘুড়ি Read More »

ভ্রোমর ও কলি

ভ্রোমর ও কলি আলতাফ শেহাব হলুদ রঙের ঝুটিওয়ালা একটি কালো ভ্রোমর যে কতোরকম পুলক নিয়ে আসতে পারে স্কুল পলাতক কোন কিশোরের মনে; তা আমার চেয়ে আর কে বেশী জানবে? শীতের সকালে সকল আলস্যকে উপেক্ষা করে ছুটতাম আমরা কিন্ডার গার্টেন স্কুলের ছাত্ররা। রাস্তার দুইধারে সাদা ভাটফুলের সুতীব্র গন্ধ ছুটতো আমাদের পিছু পিছু। আটবছর বয়সি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। নেশা বোঝা সে অনেক পরের ব্যাপার। হলুদ রঙের ঝুটিওয়ালা একটি কালো ভ্রোমর স্তব্দ ক’রে দিয়েছিল কুয়াশার চাদরমোড়া শীতের সকাল। জগতের সব সময়ের কাঁটাই থেমে গিয়েছিল কি এক অপরূপ নেশায়। আজো অনাবিষ্কৃত র’য়ে গেছে কী ছিল সেদিনের সেই কালো ভ্রোমরের গুঞ্জরণে। আমার সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। বাড়ী ফিরেছি দিয়াশলাইয়ের বাক্শোবন্দি কালো ভ্রোমরের গুনগুন্ কানে এবং তানে নিয়ে। আমাদের কালো ভ্রোমরদের প্রিয় ছিল যে ভাটফুল। যে ফুলের নেশা তাদের নিয়ে আসতো আমাদের মতো দুষ্ট বালকদের হাতের নাগালে। সে ফুলের মধু কোথায় ছিল তা জেনেছি অনেক পরে। তার তিক্তস্বাদ হাতে নিয়ে বাড়ী ফিরে খাওয়া-দাওয়া মাথায় উঠেছে কতোদিন। আমাদের সহপাঠি একমাত্র বালিকাটির হাতঘুরে যেদিন ভাটফুল বাড়ী পর্যন্ত সারারাস্তার সঙ্গী ছিলো; সেদিন জেনেছিলাম ফাটফুলের তীক্ত রসেও যে এক প্রকার মধু সঞ্চার হয় মানুষের মনে, গুঞ্জরিত হয় হাজার ভ্রোমরের গান।

ভ্রোমর ও কলি Read More »

ফিঙে ও শঙ্খচিল

ফিঙে ও শঙ্খচিল আলতাফ শেহাব সূর্য উঠার আগেই ঘর্মাক্ত শরীরে বিছানা ছাড়ি প্রতিদিন। বসন্তকাল, নরোম বাতাস, মাঠে বিশাল সবুজের সমারোহ। কৃষকরা আগাছা নিড়ানীতে ব্যস্ত। খেতের আলে ছড়িয়ে থাকা খুঁটিগুলোতে পুচ্ছ দুলাচ্ছে ফিঙেরা। সজাগ দৃষ্টি; ঠোঁটে ঘাস ফড়িঙের লালসা। আমরা দুষ্ট বালকের দল পতঙ্গফাঁদ নিয়ে প্রস্তুত। আমাদের ছোট ছোট চোখে শালিকের দৃপ্তি। ভোরের আলো প্রসারিত হওয়ার আগেই ধানের খেত ভরে ওঠে মা পাখিদের কলরবে। বাচ্চার আহার সংগ্রহে বেপরোয়া শালিকের দল। আমাদের মুগ্ধ চোখ মাঝেমাঝেই সতর্ক হ’য়ে ওঠে পতক্সগ ফাঁদের ঈশারার প্রতি। হঠাৎ পতক্সগফাঁদে আটকা পড়া একটি শিশু ফিঙের তীব্র চিৎকারে আমাদের ধ্যান ভাঙ্গে। ছুটে যাই তড়িৎ। ফাঁদের কাছাকাছি যেতেই কানের কাছে ঝপাঙ নেমে আসে বলিষ্ঠ ফিঙের ডানার সুতীব্র ঝাপট। ফিঙে দলপতির দূরন্ত সাহস আমাদের বিমূড় করে দেয়। থমকে যায় আমাদের সোনালী সকাল। ধীরে ধীরে যৌবনপ্রাপ্ত হয় সকাল। আকাশে নেমে আসে ক্ষুধার্ত শঙ্খচিলের দল। কাঁকড়া শিকারী শঙ্খচিলেরা সুতীব্র বেগে নেমে আসে নিচের দিকে; ছোবল মেরে নিমেশেই চ’লে যায় আকাশে। বিচিত্র রকমের এসব খেলায় মেতে উঠি আমরা। দু’টি দুরন্ত ফিঙের অসীম সাহস আমাদের মনোযোগকে আরেকবার টেনে নিয়ে যায় দিগন্তের ওপারে। ফিঙেদু’টি একের পর এক বেপরোয়া ডানার ঝাপটে দিশেহারা একটি শঙ্খচিল অসহায় ঘুরতে থাকে আকাশে আকাশে। অবাক বিস্ময় নেমে আসে আমাদের আকাশে। আমাদের চোখে স্থীর হ’য়ে থাকে দু’টি দুরন্ত ফিঙের কাছে একটি বলিষ্ঠ শঙ্খচিলের অসহায় আত্মসমর্পনের দৃশ্য।

ফিঙে ও শঙ্খচিল Read More »

পাতা ও ধূলি

পাতা ও ধূলি আলতাফ শেহাব একদিন বিপন্ন দুপুরবেলা আমাদের উঠানে ধূলিঝড়ের সে এক বিস্ময়কর অপরূপ খেলা। কতোরকম শুকনো পাতার বিচিত্র নাচন। তারা কাকে যেনো ঘিরিয়া ঘিরিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচে আর সুতীব্র বেগে দূরে চ’লে যায় অজানার পথে। আমরা তাদের পিছু পিছু ছুটে বেড়াই। এ বিচিত্র খেলার সঙ্গি হ’তে চাই। কিন্তু আমাদের হতবাক ক’রে তারা যেনো কোন সুদূরে মিলিয়ে যায়। বাতাসের সুতীব্র দাপট আমাদের ঠেলে নিয়ে যায় ঘরের চৌকাঠে দরোজার কোনে। আমাদের শিশুহাতের যত্নে বেড়ে ওঠা পুঁই লতাটির পাতায় পাতায় বাতাস আর ধূলিদের সেকি আমোদ-উল্লাস। প্রিয় পুঁই পাতারা সুপক্ক শিমুলের তুলা আর মেহগনি বীজপত্রদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাতাসের সাথে নৃত্যরত। শিমুলের তুলারা মেঘেদের মতো ভেসে বেড়ায় বাতাসে বাতাসে। মেহগনি বীজপত্ররা ছড়িয়ে পড়ে মাঠে প্রান্তরে। অসহায় ধূলিরা পুঁই পাতাদের শরীরে মাখামাখি হ’য়ে বাতাসের সুতীব্র দাপটে জমিনে গড়াগড়ি যায়। এভাবেই ঘনকালো মেঘেরা বর্ষণ হ’য়ে নেমে আসে ধরণীতে। থমকে যায় বাতাসের তান্ডব। আর আমাদের প্রিয় পুঁই পাতারা ধাতস্থ হ‘য়ে ওঠার আগেই ধূলি আর বৃষ্টির জলে গড়াগড়ি যায়। অবিরাম বর্ষণক্লান্ত আকাশ যখোন পূর্ণবার সূর্যের সঙ্গি হয় দিনের আলোয়; আমাদের প্রিয় পুঁই পাতাদের সর্বাঙ্গে ধূলিদের সেকি অপরূপ উজ্জ্বল দৃপ্তি। তারপর বহু দুপুর গত হ’য়ে গেছে আমাদের জীবনে। বহু দাম্পত্য দুপুর ফলবতি হয়েছে কোথাও কোথাও। আমাদের প্রিয় পুঁই পাতা আর ধূলিদের সেই অপূর্ব রমণদৃশ্যটি তার নিজস্ব দৃপ্তিতে আজো উজ্জ্বল স্বমহিমায়।

পাতা ও ধূলি Read More »