আলতাফ শেহাব

নুন আগুনের সংসার

নুন আগুনের সংসার আলতাফ শেহাব দেবীর কপালেআঁধার রঙের প্রদীপ চন্দন,চাঁদবনে আজ দেবতার প্রিয় গ্রহণ। ছায়া-বৃক্ষের গহীন নির্জনেমহুয়াবনে ঝর্ণার জলসিঁথানেঅথবা রতিক্লান্ত দুপুরের নুন-আগুনেআগুনে… সিঁথানে… বনে…শুধুই আঁধারের আগুন তার নষ্টমনে। মেঘের আঁচলে লাল ঢেলেঅনল জলের বর্ষায় ভেজেন।আসক্তির শুকনো হাড়ে বিষ ঢেলেস্বর্গীয় তৃপ্তিতে জিভ ভেজান।তিনি পোড়া রক্তের আঁধারে অপূর্ণ বীজ গর্ভে ধরেন। আকাশের অসীমে … … ব্রাহ্মণদেবতার হাঁটে গিয়ে পৈতা বেচেন,দেবী ও আঁধারের সঙ্গমের দৈর্ঘ্য মাপেন।

নুন আগুনের সংসার Read More »

আমীন গারীবকে জিবরান

মে মাস ১৯০৩, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক ‘আলমুহাজের’ পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক আমীন গারীব বোস্টন শহর ভ্রমনে এসেছিলেন। আমীনকে স্বাগত জানাতে আসা যুবক কাহ্‌লিল জিবরান লোকজনের ভীড়ে সাংবাদিককে জড়িয়ে ধরে তার স্বভাবসুলভ স্থবিরতা, সুন্দর ব্যবহার এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বাগত জানালেন। পরবর্তিতে জিবরান গারীবকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জিবরান তাকে নিজের ছবিগুলো দেখিয়েছিলেন এবং একটি পুরাতন দিনলিপি উপহার দিয়েছিলেন যাতে তার চিন্তা ও ধ্যানের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ ছিল। আমীন তার ছবিগুলো দেখে এবং দিনলিপির কবিতাগুলো পড়তে পড়তে অনুধাবন করতে শুরু করলেন কত বড় সৃজনশীল কবি এবং দার্শনিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জিবরানের সবকিছু দেখে আমীন খুবই রোমাঞ্চিত হলেন, সাংবাদিক জিবরানকে তার দৈনিকে কলামিষ্ট হিসাবে কাজ করার আহ্বান জানালেন। এই আমীন গারীবই কাহ্লিল জিবরানকে বোস্টনের নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনলেন এবং আরবের পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। গারীব তার এক সম্পাদকীয়তে বলেছিলেন, “আরবি কথাসাহিত্যে একজন তরুণ চিত্রশিল্পীর প্রথম রচনার সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে এই পত্রিকাটি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করছে যার চিত্রকলা আমেরিকার জনগণকে মুগ্ধ করেছে ; তিনি বীরত্বের জন্য বিখ্যাত নগরী বস্‌রির কাহ্‌লিল জিবরান। Tears and Laughter-এর এই রচনাটি আমরা ক্যাপশনে কোন উদ্ধৃতি ছাড়াই ছাপলাম। পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিলাম, তারা তাদের মার্জিত রুচি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করবেন।” আর তখনই প্রথমবারের মতো জিবরান কোন আরবি দৈনিকে ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখতে পেলেন। জিবরান যখন Spirits Rebellious নামে বইটি লিখলেন; যে বইতে তিনি Rose El Haines– এর গল্প বর্ণনা করেছেন যার জন্য জিবরান লেবানন থেকে বিতাড়িত হলেন এবং চার্চ তাকে ধর্ম থেকে বহিঃস্কার করল; বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন জিবরানের সেই বন্ধু আমীন গারীব। নিন্মোক্ত চিঠিতে দৃষ্টি গোচর করলে দেখা যাবে আমীনের জন্য জিবরানের ভালোবাসা কত গভীর ছিল। আমীন লেবাননে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জিবরান বন্ধুকে ভ্রমনের জন্য অভিবাদন জানালেন এবং বিশ্বাসী বন্ধুকে নিজের ভ্রমন পরিকল্পনা সম্পর্কেও জানালেন। আমীন গারীবকে জিবরান                                                                                                                                                                                                     বোস্টন,                                                                                                                                                                                         ফেব্রুয়ারি, ১৯০৮ প্রিয় আমীন, তোমাকে এমন একটি বিষয়ে বলতে যাচ্ছি, যা শুনলে তুমি এবং তোমার প্রতিবেশীরা খুশিই হবে; এ সম্পর্কে শুধু আমার ছোট বোন মারিনা কিছু কিছু জানে। আসছে বসন্তের শেষদিকে চিত্রকলার রাজধানী প্যারিসে যাচ্ছি, আশা করছি সেখানে একটি পুরোবছর থাকব। যে বারটি মাস আমি প্যারিসে থাকতে যাচ্ছি, আমার দৈনন্দিন জীবনে তা একটি বিরাট ভূমিকা পালন করবে। ঈশ্বরের দয়ায় যে সময়টা আমি এই আলোকোজ্জ্বল শহরে অতিবাহিত করতে যাচ্ছি তা আমার জীবনের গল্পে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমি এই মহান শহরের একদল মহান চিত্রকরের সাথে যোগ দেব এবং তাদের সান্নিধ্যে কাজ করব। আশা করছি তাদের তত্ত্ববধান এবং শিল্পকর্ম বিষয়ক গঠণমূলক সমালোচনা আমাকে লাভবান করবে। অবশ্য তারা আমাকে লাভবান করছে কি করছেনা এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ প্যারিস থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর আমার চিত্রকর্মের কদর আরও বেড়ে যাবে যা অন্ধ ধনীদের ছবি কিনতে উৎসাহিত করবে। ছবিগুলোর কদর তাদের চিত্রশৈলীর কারণে নয় বরং এই কারণে বাড়বে যে, এগুলো এমন একজন শিল্পীর হাতে আঁকা যে কিনা মহান ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের সান্নিধ্যে প্যারিসে পুরো একটি বছর সময় কাটিয়েছেন।   আমি কখনও এমন ভ্রমনের স্বপ্নও দেখিনি এবং এ ধরনের চিন্তাও কখনও আমার মনে আসেনি। আমার মত মানুষের পক্ষে এ ধরনের ভ্রমনের ব্যায় বহন প্রায় অসম্ভব ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু স্বর্গ! আমার প্রিয় আমীন- স্বর্গ এই ভ্রমনের ব্যবস্থা করেছে, আমার নিজের অজান্তেই প্যারিসে যাওয়ার রাস্তা খুলে গেছে। আশা করছি স্বর্গের বিশালতায় থেকে জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র অতিক্রম করব।   ঠিক এই মুহূর্তে যখন তুমি আমার গল্প শুনছ- জেনে রেখো, বোস্টনকে ভালবাসি বলে এখানে থাকি ঠিক তা নয় আবার নিউইয়র্ক অপছন্দ করি বলেও নয়। আমি একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি মাথায় নিয়ে এখানে থাকি, যা আমাকে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখায় এবং যা আমার অর্থনৈতিক মুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরণের পথ তৈরী করছে। আমি প্যারিসে থাকি আর বোস্টনে থাকি ‘আলমুহাজের’র অগ্রগতি বাঁধাগ্রস্থ হবেনা। প্যারিস ভ্রমন আমার জন্য একটি বিশেষ সুযোগ এনে দিল সেই সব বিষয়ে লেখার যা এই যান্ত্রিক এবং বাণিজ্যিক দেশে আমি খুঁজে পাইনা বা ভাবতেও পারিনা, যার আকাশ সবসময় হইচই আর কলরবে পরিপূর্ণ। আমি বিশ্বের রাজধানীগুলোর রাজধানীতে বসে নিজেকে সামাজিক শিক্ষায় আলোকিত করব যেখানে একসময় রুশো, লেমার্টিন ও হুগো বাস করতেন এবং যেখানে আমেরিকানদের ডলারের প্রতি যেরকম ভালোবাসা অন্তত তার চেয়ে বেশী শিল্পের কদর রয়েছে।   তোমার অনুপস্থিতে ‘আলমুহাজেরে’র সকল সংখ্যাতেই লেখা পাঠানোর চেষ্টা করব। আমার হৃদয় ও মন-প্রাণ যা কিছু ধারণ করে তার সবকিছু নিংড়ে আমি এর পাতা ভরিয়ে তুলব। আমি কোন বিশেষ লাভের আশা বা লোভ করিনা, আমি তোমার কাছে শুধু বন্ধুত্ব্ চাই। অনেক নৈতিক বিতর্কের মাঝে যদি তুমি কোন বস্তুগত তর্ক সংযোজন করতে চাও তবে ক্ষমা চাই তোমার কাছে, তুমি তোমার সম্পাদনা কর্মীদের বলো, তারা যেন আমার Tears and Laughter বইটি ফেলে রাখে; তাদের বলো, তারা যেন এই বই লেখার সময় যে বহু ক্লান্তিবিহীন রাত ব্যায় করেছি তার ফসল ঘরে তুলতে সাহায্য করে। তুমি তাদের বলো, তারা যেন আরবি ভাষার পাঠক এবং নিউইয়র্ক ও (আমেরিকার) অন্যান্য রাজ্যের ধনীদের কাছে এই বইটি বিক্রি করার বিষয়ে আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে। তুমি জান, আলমুহাজের’র সহযোগিতা ছাড়া আমি এই বইটি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবনা।   লেবাননের সৌন্দর্য্য উপভোগের সময় এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সময় মনে কোন সংশয়ের স্থান দিওনা, র্নিবিঘ্নে থেক। গত পাঁচ বছর তুমি অনেক পরিশ্রম করেছ, এখন একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। তোমার প্রশান্তির মাঝে ভবিষ্যৎ ভাবনাকে নাকগলাতে দিওনা। কি হবে তা নিয়ে ভেবনা, আলমুহাজের সকল আরবি পত্রিকার মাঝে মাথা উঁচু করে পথ চলবে। প্রতি সপ্তাহে তোমার একটি সংবাদ, আসাদ রুশতমের

আমীন গারীবকে জিবরান Read More »

বাবাকে জিবরান

বস্‌রি থেকে বাবাকে লেখা এই চিঠিখানিতে জিবরান তার দুইবোন মারিনা এবং সুলতানার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তাদের কোন এক আত্মীয় জিবরানের বাবাকে লিখেছিলেন, তার দুই মেয়ে খুবই অসুস্থ; বৃদ্ধ তার দুশ্চিšতার কথা ছেলেকে জানিয়েছিলেন। জিবরানের বাবা এই চিঠির তারিখ সম্পর্কে কিছু জানাননি। চিঠিখানি সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম দিকে অথবা এপ্রিল ফুল’র দিন লেখা। বাবাকে জিবরান                                                                                                                                                                                                     বৈরুত,                                                                                                                                                                                            এপ্রিল, ১৯০৪ প্রিয় বাবা, অপ্রত্যাশিত একটি সংবাদ পেয়ে গভীর দুঃখ ও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে লেখা আপনার চিঠিখানি হাতে পেয়েছি। আমিও আপনার মত বেদনা বোধ করছি; কিন্তু এই চিঠি লেখার পেছনে লেখকের উদ্দেশ্য এবং চিঠির কারণ সম্পর্কে আমি কিছুই জানিনা। তারা (ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন) আপনাকে চিঠিতে বলেছে আমার বোনদের একজন জটিল রোগে আক্রান্ত এবং তারা এও বলেছে, তার অসুখটি বড়সড় ব্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত। যে কারণে আমার বোনদের আপনাকে টাকা পাঠাতে সমস্যা হতে পারে। স¤প্রতি এই ভূতুড়ে চিঠির পেছনে আমি একটি কারণ খুঁজে পেয়েছি, চিঠিটি এপ্রিলের প্রথমদিন লেখা হয়েছিল। আমাদের খালামনি এ ধরণের ভদ্র এবং মজার রসিকতা করে অভ্যস্ত। তার ভাষ্যমতে আমাদের বোনদ্বয় গত ছ’মাস ধরে অসুস্থ; এটা কতটুকু সত্য তা তো শুনেই বোঝা যাচ্ছে। গত সাতমাসে মি. রয় আমাকে পাঁচটি চিঠি লিখেছেন, যাতে তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, আমার দুই বোন মারিনা ও সুলতানা দারুণ সুস্থ রয়েছে। তিনি তাদের সৎ চরিত্রের উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে সুলতানার মার্জিত ব্যবহার সম্পর্কে বলেছেন; তিনি বলেছেন আমাদের দু’জনের চেহারা, শারীরিক গঠন ও চরিত্রের দারুণ মিল রয়েছে। কথাগুলো আমাকে এমন একজন মানুষ বলেছেন যিনি আমার দেখা সবচে সৎ মানুষ। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি এপ্রিল ফুলের ঠাট্টা-তামাশা মারাত্মক ঘৃণা করেন এবং মানুষের হৃদয়ে দুঃখের সঞ্চার করে এমন বানোয়াট বিষয় অপছন্দ করেন। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি সবকিছু ঠিকঠাক আছে, আপনি আপনার মনকে শান্ত করুন।   আমি এখনও বৈরুতেই আছি। মনে হচ্ছে পুরোমাসটিই ঘরছাড়া থাকতে হবে। সেই আমেরিকান পরিবারকে অগাধ শ্রদ্ধা জানাই যাদের কল্যাণে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি সিরিয়া ও ফিলিস্তিন, যাদের কারণে মিশর এবং সুদান সফর আমার জন্য সহজ হল। যে কারণে আমি বলতে পারছিনা কবে আবার বৈরুত হতে ফিরছি। যাহোক, আমি আমার ব্যক্তিগত সুবিধার কথা চিন্তা করেই এখানে রয়ে গেছি যা আমাকে এই দেশে থাকতে সাহায্য করবে। আর তারা দু’জনেই আমার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব ভাবে। আমার ভবিষ্যৎকে সুন্দর ও সুরক্ষিত করার জন্য কি করা প্রয়োজন এখন আমি তা সন্দেহাতীত আন্তরিকতার সাথে বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি।   আপনাকে যা বলার ছিল প্রায় সবই বলা হয়ে গেছে- আমার সব আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবকে গভীর ভালোবাসা জানাই। আর শ্রদ্ধা জানাই তাদেরকে যারা নিয়মিত আমার খোঁজ করে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি- তিনি যেন আপনাদের সুস্থ রাখেন এবং দীর্ঘায়ু করেন।                                                                                                                                                                                                  আপনার পুত্র                                                                                                                                                                                                      জিবরান

বাবাকে জিবরান Read More »

আত্মপ্রতিকৃতি

কাহ্‌লিল জিবরানের চিঠি আত্মপ্রতিকৃতি (A Self Portrait) ভাষান্তরঃ আলতাফ শেহাব কাহ্‌লিল জিবরান(১৮৮৩-১৯৩১), লেবানিজ-আমেরিকান দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক, আধ্যাত্মিক কবি ও চিত্রশিল্পী। জিবরানের সর্বাধিক জনপ্রিয় বই The Prophet, আংশিক আত্মজীবনীমূলক ২৬ টি কাব্যিক রচনার সমন্বয়ে রচিত এই বইটি ২০টিরও বেশী ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ১৯২০’র দশকে বইটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের গৌরব অর্জন করেছিল। ১৯৬০’র দশকে The Prophet প্রতিশিল্পের পথ প্রদর্শক হয়ে সমনে হাজির হল। জিবরানের বহুমাত্রিক সৃজনশীল কর্মকাণ্ড সে সময় আমেরিকার সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। জিবরান বিশ্বাস করতেন চিন্তা ও যাপনের একটি সুস্থ বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন উপায় নিশ্চয় পাওয়া যাবে, যা দ্বারা মানুষ নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। “মানুষের হৃদয় সাহায্যের জন্য কাঁদে, মানুষের মন মুক্তির জন্য প্রার্থনা করে। কিন্তু আমরা তাদের কান্না অনুধাবন করতে পারিনা; শুনিওনা, বুঝিওনা। আর যে শোনে এবং বোঝে আমরা তাকে পাগল বলি। তার কাছথেকে পালিয়ে বেড়াই।” কাহ্‌লিল জিবরান ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি লেবাননের বস্‌রিতে একটি খ্রিস্টান অধ্যুষিত পাহাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। খুব অল্প বয়সে মেধাবী শিশু জিবরান আঁকাআঁকি ও লেখালেখি শুরু করেন। জিবরানের মা কামিলা রাহ্‌মি তার সন্তানদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান, তাদের বাবা ওয়ালনাট বাগানের মালিক কাহ্‌লিল লেবাননেই থেকে যান। জিবরানদের পরিবার প্রথমে বোস্টনে বসবাস শুরু করে, সেখানে তার মা লাইনেন ও ফিতা বিক্রি করে জিবিকা নির্বাহ করতেন। একবছরের মধ্যেই তিনি পর্যাপ্ত টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন যা দিয়ে ছেলে পিটারকে শুকনো মালপত্রের দোকান খুলতে সাহায্য করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে বৈরুতের আল-হিকমা কলেজে আরবি সাহিত্যে পড়ালেখা করার উদ্দেশ্যে জিবরান দুই বছরের জন্য লেবাননে ফিরে আসেন। জিবরানের শিল্পীসত্ত্বা বিকশিত হতে থাকল এবং আলোকচিত্রী এফ. হল্যান্ড ডে’র সাথে পরিচয় হল। জিবরান তার কছে শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে দীক্ষা নিলেন। এরই মধ্যে জিবরান বোস্টন সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করলেন, সেখানে তার সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের সাথে যোগাযোগ হল। ২০ বছর বয়সে মা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বোন মারিনা পরবর্তীতে তাকে একজন চিত্রশিল্পী ও লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করেন। সারাজীবন জিবরানকে সবচে বেশী সহযোগিতা করেছিলেন ক্যাম্ব্রিজের একটি প্রগতিশীল বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মেরী হ্যাস্কিল। তিনি জিবরানের সকল ইংরেজী বইয়ের সম্পাদনা করতেন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিকভাবেও সহযোগিতা করতেন। ১৯০৪ সালে বোস্টনে জিবরানের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। তার প্রথম বই Al-Musiqa(১৯০৫) সঙ্গীত বিষয়ে লেখা। ১৯১২ সালে এই বইয়ের অনুকরণে ছোটগল্প ও উপন্যাসিকার দুইটি সংকলন বের হয়। ১৯০৮ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত অগাস্ট রোডিনের সাথে প্যারিসে চিত্রকলা বিষয়ে পড়ালেখা করেন। ১৯১২ সালে লেখালেখি ও ছবি আঁকার স্বার্থে নিউইয়র্কে স্থায়ী হন, তার বইতে অতিমানবীয় বিষয়াবলী সংশ্লিষ্ট হয়, জিবরানের ছবির মূল বিষয়বস্তু পরষ্পর সংলগ্ন মানুষের নগ্ন শরীরের কোমল রূপ। জিবরান লেখালেখি শুরু করেছিলেন আরবিতে, আধুনিক আরবি সহিত্যের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি লেবানিজ এবং আরবি ভাষাভাষী লোকজনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে লিখেছিলেন। ১৯১৮ সাল থেকে মূলতঃ ইংরেজীতে লেখা শুরু করেন এবং ১৯২০ ও ১৯৩০ দশকের কবিতার ভাষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। Alfred Knopf প্রকাশনী হতে প্রকাশিত প্রথম বই The Madman(১৯১৮), গল্প ও কবিতার মাঝামাঝি- বাইবেলের ছন্দে লেখা স্বতঃসিদ্ধ প্রবাদ ও নীতিগল্পের একটি ছোটখাটো সংকলন। জিবরান তার মাতৃভূমি এবং মানবতার জন্য হুমকি শয়তানকে প্রতিহত করার জন্য মহাপুরুষোচিত স্বর ব্যবহার করতেন। আধ্যাত্মিকতা ও সুন্দরের সমন্বয়ে গঠিত তার বিচিত্র এই প্রকাশভঙ্গি পরবর্তীতে ‘জিবরানইজম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। “আমি আমার নিজের কাছে অচেনা। আমি আমার ঠোঁটকে বলতে শুনি কিন্তু কানের কাছে তা অচেনা ঠেকে। মনে হয় দেখছি, আমারই এক লুকানো সত্ত্বা হাসছে, কাঁদছে, বিচিত্র দুঃখবোধ; এসব কারণে নিজেকে দেখে নিজেই বিমোহিত হই এবং এইবোধরা আমার মনের কাছে ব্যখ্যা চেয়ে প্রশ্ন করে। কিন্তু আমি অজানা, গোপন, কুয়াশা আবৃত নৈঃশব্দের ভেতর চলে যাই। (‘The Poet’ থেকে) ১৯২০ সালে জিবরান আরব লেখকদের জন্য ‘Aribitah(pen bond)’ নামে একটি সংগঠন গঠন করার মাধ্যমে প্রাচীন রক্ষণশীল আরবি সাহিত্যে বিপ্লবের হাতকে শক্তিশালী করেন। নতুন চিন্তাকে প্রকাশ করার শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে আর্ভিভূত, নিউইয়র্কে প্রকাশিত প্রথম আরবি দৈনিক Al Magar; জিবরান এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। জিবরান সৃজনশীলতার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছিলেন; যদিও তিনি কাব্য সাহিত্যের বিশাল কোন কবি ছিলেননা, গদ্যের মত করে লেখা তার বেশীরভাগ রচনাকে কবিতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। নিজস্ব চিত্রকর্মের মাধ্যমে নিজের একটি বইয়ে অলংকরণও করেছিলেন। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে পাকস্থলীতে রোগাক্রান্ত হয়ে ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র ৪৮ বছর বয়সে নিউইয়র্কে এই মহান দার্শনিক, চিত্রশিল্পী ও কবির জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পর এই মহান শিল্পীকে তার জন্মভূমি লেবাননে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে সমাধীর পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয় জিবরান মিউজিয়াম। জিবরান তার সকল বইয়ের র‌্যয়েলেটি নিজগ্রামের নামে উইল করে যান। “যখন আত্মারা তাদের আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়, আমার হৃদয়দুঃখের অন্ধকারে তলিয়ে যায়।রাত্রি! আমি তোমারই মত। যখন সকাল আসেতখন আমার সময় নিঃশেষ হতে থাকে।” জিবরানের মৃত্যুর প্রায় ২৮ বছর পর ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হলো A Self Portrait (আত্মপ্রতিকৃতি)। জিবরান সারা জীবন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে বহু চিঠি লিখেছেন। এই বইটি মূলতঃ জিবরানের লেখা সেইসব চিঠির একটি সংকলন। প্রায় সবগুলো চিঠিরই সংক্ষিপ্ত ভূমিকা সংযোজিত আছে; যার ফলে প্রাপকের সাথে লেখকের সম্পর্কের ধরণ, চিঠিটি লেখার সময়কাল ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। চিঠিগুলো পড়ে খুব সহজেই জিবরানের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ছোঁয়া যায়; নিবীড়ভাবে উপলব্ধি করা যায় জিবরান ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায় কি পরিমান দায়ীত্বশীল ছিলেন।                                                                                                                                                                                 -আলতাফ শেহাব All Posts Uncategorized অনুবাদ কথাসাহিত্য কবিতা   Back অনুগল্প ছোটগল্প মুক্তগদ্য আমীন গারীবকে জিবরান আত্মপ্রতিকৃতি/September 8, 2024 মে মাস ১৯০৩, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আরবি দৈনিক ‘আলমুহাজের’ পত্রিকার সম্পাদক ও মালিক আমীন গারীব বোস্টন শহর ভ্রমনে এসেছিলেন। আমীনকে… বিস্তারিত বাবাকে জিবরান আত্মপ্রতিকৃতি/September 8, 2024 বস্‌রি থেকে বাবাকে লেখা এই চিঠিখানিতে জিবরান তার দুইবোন মারিনা এবং সুলতানার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তাদের কোন… বিস্তারিত

আত্মপ্রতিকৃতি Read More »

রাতের কফিন

রাতের কফিন আলতাফ শেহাব আজকাল অনেক হৈ-চৈ হট্টগোলের মধ্যেও হঠাৎ করে একা হয়ে যাওয়া যায়। বন্ধুদের তুমুল আড্ডার মাঝখান থেকেও মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো হঠাৎ করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায়। মাঝে মাঝে নিজেকে সি.এন.জি চালিত গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারের মতো মনে হয়। নিরাপদ সাশ্রয়ী কিন্তু যে কোন সময়ে তুমুল বিস্ফোরণের মাধ্যমে দুনিয়াকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানান দেয়া যায়। খুব সস্তায় শ্রম বিক্রি করি, কর্তা অনায়েসেই নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত হতে পারেন। নিজের বাজার দর যাচাই করবার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। খুবই হালকা মেজাজের সাধারণ মানের জীবন যাপন, ন্যূনতম বৈচিত্র নেই। সস্তাদরের রোম্যান্টিসিজমে পেয়ে বসে মাঝে মধ্যে, ছকে বাঁধা জীবন-যাপনে এসব খুব কমই হয় বছরে… ছ’মাসে একবার…দু’বার। মধ্যরাতের নগর জীবনের স্বাদ নিতে হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। আজ হাঁটতে হাঁটতে রেল ষ্টেশনের দিকে গেলাম। প্রতিদিনের মতো একই জায়গায় যাদুর বাক্স নিয়ে বসে আছে যাদুমিয়া। লোকজন খুব একটা নেই। যাদুমিয়াও চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যাদুমিয়ার সাথে কখনোই খুব একটা জমিয়ে উঠতে পারি না। নান রকম লোক ভুলানো কসরতের মতো খুব ব্যস্ত যাদুমিয়া নিজেও বন্ধি থাকে গন্ডিবদ্ধ যাদুর বাক্সে। কখনোই তেমন একটা পাত্তা দিতে চায়না। আজ একটু ব্যতিক্রম যাদুমিয়া, দেখেই চা-খাওয়ার আমন্ত্রন জানায়। সচরাচর কারো সাথে এমন আচরণ করে না যাদু মিয়া। চা খেতে খেতে প্রশ্ন করলাম- কি যাদুমিয়া আজ মনে হচ্ছে মনটা খুব ভাল? যাদুমিয়ার অদ্ভুত রকমের উত্তর- বড়মিয়া আপনাদের চশমা পরা চোখ খুব টানে; কিন্তু ভয়ে কখনোই কাউকে বুঝতে দেই না। জানতে চাইলাম- চশমার মতো এই সামান্য জিনিসটা কেন টানে আর ভয়ই কিসের? যাদু মিয়ার সরল উত্তর- বড় মিয়া আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ! আপনাদেরকে কাছে টানলে ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে তাই আপনাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই। একসময় আপনাদের মতো চশমাপরা বুদ্ধিমান হওয়ার খুব শখ ছিল; বড্ড লোভ হতো। অনেক ধরণের আলাপ আলোচনার মাঝে হঠাৎ যাদুমিয়ার খেয়াল হয় রাত বেড়ে চলছে। যাদুর বাক্স কাঁধে চাপাতে চাপাতে হেসে বলে, বড়মিয়া রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি যাদু মিয়ার পাশাপাশি হাটতে থাকি এ নিয়ে যাদুমিয়ার কোন উচ্চবাচ্চ নেই। রেলনাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে যাদু মিয়াকে নানা রকম প্রশ্ন করছি, উত্তর দিচ্ছে; পাল্টা প্রশ্ন করছে, উত্তর দিচ্ছি। কখনো কখনো হঠাৎ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ… কারো মুখে কোন কথা নেই। আমরা একটি গ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন ধরে হাঁটছি। ঘুটঘুটে অ›ন্ধকার, আশেপাশে তেমন কোন সাড়া শব্দ পওয়া যচ্ছে না। মাঝেমাঝে হঠাৎ করে মা হারা বকনা বাছুরের চিৎকারের মতো শিশুদের কান্নার শব্দে নিঝুম রাতের নিদ্রা ভঙ্গ হচ্ছে… আবার চুপ। একসময় যাদু মিয়াকে তার যাদুর বাক্স নিয়ে প্রশ্ন করি। যাদু মিয়া ক্ষেপে যায় কিন্তু হাসতে হাসতে বলে- বড়মিয়া এ কারণেই আপনাদের চশমাকে ভয় পাই। গরীবের পেটে লাত্থি দেয়ার দরকার নেই, আপনি আপনার পথে যান আমি আমার পথে যাই; রাত অনেক হয়েছে বাড়ি ফিরে যান একা যেতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না আমি জানি। আমি কথা না বাড়িয়ে যাদুমিয়ার পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। যাদুমিয়া অনেকক্ষণ কোন কথা বলে না, চুপচাপ হাঁটে। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে হাতের টর্চটি জ্বেলে রাস্তা পরখ করে নেয়। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে, একটা বেফাস প্রশ্ন করে কেমন একা হয়ে গেলাম। অনেক দূর যাওয়ার পর যাদুমিয়া মুখ খোলে; খুব হতাশ গলায় বলে- বড়মিয়া ধান্দার অবস্থা খুব খারাপ। যাদুমিয়ার যাদুতে এখন আর মানুষের পেট ভরে না। মানুষগুলো এখন কেমন হিংস্র হয়ে গেছে। ফোটকাটাই এখন রোজগারের একমাত্র আশ্রয়… ফোটকা না থাকলে এতদিনে না খেয়ে মরতে হতো। রক্ত-পুঁজের মাঝে দাঁড়িয়ে দিব্বি রোজগার করছি- খাচ্ছি- ঘুমাচ্ছি- সন্তান লালন পালন করছি। একটা জীবনকে কিভাবে নিঃশেষ করে দিচ্ছি শুধু মাত্র নিজেদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য… মানুষের খুব লোভ! মাঝেমাঝে নিজের প্রতি খুব ঘেন্না হয়; সন্তানদের দিকে তাকালেই মনে হয়Ñ এদের আমি কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছি… ক’দিন পর এদের প্রশ্নের কি জবাব দেব… বাঁচার জন্য কোথায় পালাব… কার কাছে আশ্রয় নেব। আমার তখন ফোটকার কথা মনে হয়। যাদু মিয়া যাদুর বাক্সের পাশেই বসে থাকে ছেলেটা। ফোটকা মাছের মতোই পেটটা অদ্ভুত রকমের ফোলা, মাথাটা ছোট, হাড্ডিসার হাত-পা, চোখ দু’টো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। পেশাগত কারণে অনিবার্য ভাবেই গলাটা ফ্যাসফ্যাসে ভাঙ্গা। একদিন ফোটকার কসরৎ দেখছিলাম বসে, ভয়ের চেয়ে উল্টো কষ্টই বেশি পেয়েছিলাম। বুকটা চিন্ চিন্ করে ব্যথা করেছিল, দম বন্ধ করে অনেক কষ্টে কান্না চাপা দিয়েছিলাম। ফোটকার কসরৎ বিশেষ কিছুই নয়, সে নির্বিঘ্নে সারাদিন টিউব লাইটের ভাঙ্গা টুকরো চিবিয়ে খেয়ে যায়। মাঝে মাঝে লোক সমাগম বাড়লে সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কাঁচের টুকরোগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার ততোধিক দ্রæতার সাথে উঠে দাঁড়ায়, সবাইকে ছালাম জানায়। ফ্যাসফ্যাসে গলায় সবার কাছে হাত বাড়িয়ে টাকা চায়। ফোটকার এ সকল কসরৎ এর ফলেই যাদুমিয়ার বেশির ভাগ আয়-রোজগার হয়। কিন্তু যাদু মিয়া এসবে বিশেষ একটা সস্তি পায় না বারবার আশ্রয় খোঁজে ছুটে পালিয়ে যেতে চায় তার সোনালী অতীতের দিকে। যাদু মিয়া ধীরে ধীরে বলে- বড়মিয়া ধান্ধার রকম সকম কত পাল্টে গেছে এখন! মানুষের জীবন ক্ষয় করে তিন বেলা খাবার জোগাড় হবে কিনা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি না। অথচ বাবা যখন এই যাদুর বাক্স হাতে দিয়ে পৃথিবী থেকে মুক্তি নিলেন; বেশ সুখেই তো দিন কাটছিল। খালি যাদুর বাক্সে তুড়ি মেরে কাগজের ফুল হাতে ধরিয়ে দিলে মানুষ খুশিতে পয়সা ছুড়ে মারতো… চোখ বন্ধ করে সুখের সাদা পায়রা উড়িয়ে দিয়ে পেটের জ্বালা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত… যুবকের বুকের কাছে সাদা রুমাল নাড়িয়ে দিয়ে ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে থাকা যেত…! হঠাৎ খুব দ্রুতগামী একটা মালবোঝই ট্রাক বিকট গর্জনে আমাদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেল। যাদুমিয়া কোন কথা না বলে তার গ্রামের পথে হাঁটা ধরলেন। আমি বোকার মতো অদ্ভুত বোবা কান্না বুকে নিয়ে ব্রীজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম…। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল… ধীরে ধীরে আকাশ ফর্সা হতে লাগল। গ্রামের রমণীরা আধো আলো আঁধারিতে আলুথালু শাড়ীর আঁচল জড়িয়ে নদীতে নামছে; রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সিক্ত বসনে লজ্বাবনত পায়ে আবার বাড়ী ফিরছে। দাঁড়িয়ে দেখছি… নববধুর মতো লাজুক লাল সাড়ী পরা সূর্যটা পুব আকাশে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোর… দিন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে… আমি দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম; সেই পথেই ষ্টেশনে ফিরে আসি। ষ্টেশন এখন বেশ জমজমাট। বড় হোটেলটির পাশে এসে দাঁড়ালাম। ফোটকা তার সেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসে আছে। একটি খুচরা পয়সার কৌটা নিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াচাড়া করছে। তার সেই বিদ্ঘুটে ফ্যাসফ্যাসে গলায় দোকানের একটি ছেলেকে ডাক দেয়। ছেলেটি প্রথমে তার ডাকে পাত্তা দেয় না পরে এক রকম বিরক্ত হয়েই ফোটকার কাছে আসে। ফোটকা গুনে গুনে কিছু খুচরো পয়সা ছেলেটির হাতে দিয়ে সিঙ্গারা দিতে বলে। কোটর থেকে বেড়িয়ে আসা সেই অদ্ভুত নিরুত্তাপ চোখে নির্বিকার তাকিয়ে থাকে রোদের দিকে… তার গায়ের বড় বড় ক্ষতগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছি ভাঙ্গা টিউব লাইট খেলে কি তাহলে মানুষের ক্ষিদে মরে না?

রাতের কফিন Read More »

অনন্তের পথে

অনন্তের পথে আলতাফ শেহাব এক.এ যেনো অনন্ত পথ হাঁটা। বাস, রিকশা শেষে সরু ক্ষেতের আল। তারপর চারপাশ জংলায় ভরা পায়ে চলার পথ পেরিয়ে উচু টিলার উপর সামান্য সমতলে তাঁর বাস। উঠানে একটা পুরোনো আমগাছের ছায়া, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরো কিছু ফলের গাছ। হোগলার বেড়ায় ঘেরা পাহাড়ি ছনের চালার ছোট্ট কুড়েঘর, দরোজায় কড়া নেই। চালার নিচেই এক পাশে বারান্দার মতো জায়গায় দু’চোখের ছোট্ট উনুন। একদিকে ভাত ফুটছে, অন্যপাশেরটায় ডাল। উনুনের পাশে পিঁড়িতে বসে লাল মলাটের বই পড়ছেন ইয়াকুব আলী। পরনে সবুজ রঙের বাটিকের লুঙ্গি, গলায় লাল-সাদা চেকের গামছা জড়ানো। দূর থেকেই কাঁচা-পাকা দাঁড়ির আচ্ছাদন ভেদ করে প্রশান্ত চেহারা দিপ্তি ছড়াচ্ছে। আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন, হাঁসি দিয়ে কুশল বিনিময় শেষে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন। শিতল পাটির পর্দা সরানো আগে আমি বুঝতেই পারিনি, এ ঘরে আলো বাতাস প্রবেশের এতো সুন্দর সুব্যবস্থা আছে। ঘরের চারপাশেই মেঝেতে থরে থরে বই সাজানো আছে। এককোনে মাটির কলসে পানি রাখা আছে, ঢাকনার উপর একটি স্টীলের গøাস উপুড় করে রাখা। আমাদের পানি খেতে বলে বেরিয়ে গেলন ইয়াকুব আলী। বিছানায় ছাড়ানো ছিটানো বইগুলো একপাশে রেখে বালিশে হেলান দিয়ে বসলাম। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি। বেলা এগারোটা, বাইরে কাঠফাটা রোদ্দুর। ঘরের ভেতরে তার ছিটেফোঁটাও টের পাওয়া যায় না। বিশাল আমগাছের শীতল ছায়া, আম পাতার ঝিরঝিরে বাতাস। শুনশান নিরবতা, মাঝে মাঝে দু’য়েকটা পাখির কলতান। আমগাছের মগডালে বহু পাখপাখালির আবাস। দূর আকাশের সীমানায় জ্বলজ্বল করছে কৃষ্ণচূড়ার লাল, রাধাচূড়ার সোনালী আভা। বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ইয়াকুব আলী স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে আর নগরে ফিরে যাননি। তাঁর বর্তমান আস্তানাটি পৈত্রিক ভিটা না, বহুদিন ধরে পরিত্যক্ত একটি বসতভিটা। প্রপিতামহদেরও আগের কোন পূর্বপুরুষের বসতি ছিল এখানে। নাগরিক কোলাহল থেকে দুরে, এই নির্জনতায় শোক উৎযাপন করছেন। কোলাহলে শোকের আয়ু কমে যায়। আজ আমরা এসেছি মূলত: ভদ্রলোকের স্বেচ্ছা নির্বাসনের খবর সংগ্রহ করতে। কবি নাজিম হিকমত তার জেলখানার চিঠি কবিতায় লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকে আয়ু বড়জোর এক বছর। অধ্যাপক ইয়াকুব আলী কবির এই বাণীকে একেবারেই ভুল প্রমান করে বিগত পাঁচ বছর ধরে এই নির্জনবাসে আছেন। পাঁচ বছর আগের এই দিনে গাছ কাটার বন্ধ করার দাবীতে সড়কে অবস্থানরত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অয়ন। জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিল ইয়াকুব ও রাশেদা দম্পত্তির একমাত্র সন্তান অয়ন আরিয়ান। রাজপথেই জীবনাবসান হয় অয়নের। উন্নয়নের নামে নগরের সড়ক বিভাজনের গাছ কাটার প্রতিবাদে, সহযোদ্ধাদের সাথে অবস্থান কর্মসূচী পালন করছিল অয়ন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ারও সময় পাওয়া যায়নি। অয়নকে সমাধিস্থ করা হয় গ্রামের বাড়িতে, পারিবারিক গোরস্তানে। একমাত্র সন্তান হারানোর শোক সামলে উঠতে পারেনি স্ত্রী রাশেদা আলী। সেই রাতেরই কোন এক সময়ে সকলের অগোচরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পাড়ি জমান পরোপারে। সন্তান হারানোর ব্যথা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত স্মৃতিতে অক্ষয় থাকে। দুই.রক্তে লিউকেমিয়া ধরা পড়ার আগে, কখনোই বোঝা যায়নি অয়ন ক্যানসারে আক্রান্ত। স্ত্রী রাশেদা আলীর সংসারে পিতা-পুত্র রাজার হালেই জীবন যাপন করেছেন। পরিপাটি সংসারে সবকিছুতেই সময় ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছিলেন রাশেদা। কিন্তু কোন কিছুতেই শেষ রক্ষা হলো না। বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্র অয়ন বুঝতে পারলেন বাঁচার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। নিজের এই দূরাবস্থা ভাবিয়ে তোলে অয়নকে। বিশ্বজুড়ে তার মতো এমন হাজারো মানুষ ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যাতে তাদের কোন হাত নাই। কিছু মানুষের অতিরিক্ত লোভে পরিবেশের ভারসাম্য হীনতাই এসব সমস্যার মূল কারন। বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুসারে ক্যানসার সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে- বিষযুক্ত খাবার ও পরিবেশ দূষণ। মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে, জীবনের অবশিষ্ট সময়গুলো ভিন্নভাবে যাপনের সিন্ধান্ত নেয় অয়ন। যোগাযোগ গড়ে তোলেন সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পারিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সাথে, যুক্ত করেন বন্ধুদেরও। বিশ্বের নানা প্রান্তে অয়নের মতো সচেতন মানুষেরা বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে কথা বলছে। আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছে, বিশ্ব নেতাদের উদ্যোগি হতে বলছে। রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, সারা পৃথিবীর মানুষকে সর্তক করছে। সন্তানের এমন অভূতপূর্ব সিন্ধান্তকে স্বাগত জানান ইয়াকুব আলী দম্পতি। ছেলের সাথে নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ হন রাজপথে। যতোটানা আন্দোলনের তাগিদে, তারচেয়ে বেশী অন্তিম সময়ে সন্তানের কাছাকাছি থাকার লোভে। ছেলের মরণ ব্যধি নিরাময়ের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয় বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে বহু চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করেন। কেউই আশার বাণী শোনাতে পারেনি তাদের। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ধ্বংসের নানামুখী চক্রান্ত, জলবায়ু বিনষ্টের মানবতা বিরোধী সকল উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দেয় অয়ন। কিন্তু নিজের শরীরের রক্তে-অস্থিমজ্জায় ক্যান্সোরের জীবানু প্রতিরোধ করতে পারেনি। সন্তানের অনন্তের পথযাত্রায় সহযাত্রী হয়েছিলেন মা রাশেদা আলী। বাবকে একা রেখে মাতা-পুত্রের এই মহাযাত্রা মেনে নিতে পারেননি ইয়াকুব আলী। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয় না আর, স্ত্রী-পুত্রের যতোটা কাছে থাকা যায় এই নির্জনবাসে থেকে।

অনন্তের পথে Read More »

স্বৈরাচারের টুঁটি চেপে ধর

স্বৈরাচারের টুঁটি চেপে ধর আলতাফ শেহাব স্বৈরাচারের হিংস্র পদাঘাতে শরীর জুড়ে জমা হোক সব ক্ষত বুকের খুনে মলম হবো আজ প্রিয় বোন আমার চলুক বিদ্রোহ। স্বৈরাচারের কালো থাবায় শাড়ির আঁচল জমিনে লুটাক, ছাড়ো আমার মাথার নিশানে বুক ঢাকো প্রিয় প্রেমিকা আমার চলুক বিদ্রোহ। সামনে দাঁড়িয়ে গুলি করে দিল! কারা হলো খুন, কারা তারা হায়েনা কোটি সহোদর সিনা টান করে দাঁড়া প্রিয় ভাই আমার চলুক বিদ্রোহ। এই শ্রাবণে রক্তস্নানে শুচি হলো ধরা আর কতো প্রাণে কাটবে মোহ, স্বৈরাচারের টুঁটি চেপে ধর প্রিয় সন্তান আমার চলুক বিদ্রোহ।

স্বৈরাচারের টুঁটি চেপে ধর Read More »

হিসাব চাই

হিসাব চাই আলতাফ শেহাব প্রজাতন্ত্রের সেবক আপনারাপ্রতিটি বুলেটের হিসাব রাখছেন, ভালোজনতার বুকে ক’টা খরচ করলেন, হিসাব রাখুন তারও। ক’খানা দালান, ইট-কাঠ-বালি ও মেট্রোস্টেশনছাই হলো নাকি অন্তর্জালের তার ও তথ্যভান্ডারহিসাব রাখছেন, সাবাস বেশ। ছাত্র-জনতা, শ্রমিক, পুলিশ, পথচারী ব্যাংকার, সাংবাদিক ও চাকুরিজীবী ছোট্ট শিশুরা, অসহায় বৃদ্ধ, ভ্যানচালক সদ্য মা হয়েছিলেন যে নারী, অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বামী-কিশোর ফেরিওয়ালা ও শারিরীক প্রতিবন্ধী দোকানিকারা কারা খুন হলেন, কতোজন?দুইশত ছেষট্টি নাকি কমবেশি আরওকড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিন, হিসাব চাইছি তারও। মর্গে জমা আছে যতো অজ্ঞাত লাশ, হতে পারত আমারওআমাদের শ্রমে কেনা প্রতিটি বুলেট, আমাকেই যদি মারোপ্রতিরোধ হবে তুমুল এবার, আছে লাখো সহোদর আমারওস্বজন হত্যার শোধ নিব একদিন, ক্ষমা নাই কোন দানবেরওআমার পতাকায় রক্তে লিখবে, অধিকার নেই কারওবিনা বিচারে খুনিও যদি মরে, হিসাব চাইছি তারও।

হিসাব চাই Read More »

খোরপোষ

খোরপোষ আলতাফ শেহাব সাতাশ বছর পর খোরপোষের মামলা দেখে প্রতিপক্ষের উকিলের মতো আপনাদের কেউ কেউও হয়তো হেঁসে উঠবেন। কিন্তু বিচারকের পক্ষে কি হেঁসে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব। সাতাশ বছর পূর্বে স্বামীর বাড়ী হতে দুই শিশুপুত্র সহ তাড়িয়ে দেওয়া হয় শবনমকে। স্বামী পরিত্যাক্তা শবনম যৌবনে মনে একপ্রকার ঘৃণা নিয়েই অনেক কিছু উপেক্ষা করেন। নানা রকম গঞ্জনা সহ্য করে বাবার বাড়িতে থিতু হন। এবাড়ি ওবাড়ি ঝি-গিরি করে বড় করে তোলেন দুই ছেলেকে। বড় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছেলেরা কেউই মানুষ হয়ে উঠেনি। মাদকাসক্ত বড় ছেলে দিনের বেশিরভাগই ঝুপড়ির ঘরে ঘুমিয়ে কাটায়, রাতভর নেশা করে প্রায়দিনই ভোরে বাড়ি ফেরে। শবনমের বাবা বেঁচে থাকতেই বাড়ির আঙিনার একপাশে ঝুপড়িটি করে দিয়েছিলেন যা ভাইদের দয়ায় এখনও টিকে আছে। রুগ্ন ছোট ছেলেটার কিস্তির টাকার টং দোকানের আয়ে কোনরকম টিকে আছে তিনজনের জীবন। না এখন আর ঝি-গিরি করার শক্তি নাই শরীরে। নিভুনিভু সংসারের বাতি যেকোন সময়ে নিভে যাবে দোকানের কিস্তি ফেল করলে। এখন আর ক্ষমতা না থাকলেও, চুরি ছেঁচড়ামি করে মেম্বার হয়ে এক সময় অনেক টাকা কামিয়েছে স্বামী মেরাজ সরদার। বাকি দুই পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের সাথেও সম্পর্ক ভালো না সরদারের। তিন তালাক বলে তাড়িয়ে দেয়ার পর সারা জীবনে একবারও যার মুখাপেক্ষী হয়নি শবনম, মনে প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়েও সাতাশ বছরের বঞ্চনার হিসাব কসতে হচ্ছে আজ তার সাথে। স্ত্রী হিসাবে দেনমোহর, নিজের ও সন্তানদের খোরপোষ সব মিলিয়ে বর্তমান বাজারে বেশ মোটা টাকার দাবি তুলেছে উকিল। মরার পরের চিন্তা নাই শবনমের, যেকোন ভাবে দাফনের ব্যবস্থা করবে লোকজন। কিন্তু যতক্ষণ বেঁচে আছে ভালোভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার নিশ্চয়তা চাই, চাই নিরাপদে শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার নিশ্চয়তা। বেশ্যার ঘরে জন্ম নিয়ে এনজিওর দয়ায় অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠা উকিল অনিমেষ এখন পিতৃ-পরিচয় জানে। কিন্তু সমাজের ঘৃণ্য এই লোকটার পরিচয়ে নিজেকে আর নোংরা করতে চায় না। অর্থলোভে নয় শবনমের মামলার মাধ্যমে যদি মেরাজ সরদারকে সর্বশান্ত করা যায়, তবেই মায়ের শেষ জীবনের চরম অর্থকষ্টের উপযুক্ত প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

খোরপোষ Read More »

সুধাময়

সুধাময় আলতাফ শেহাব সুধাময়ের মোহনীয় কণ্ঠসুধায় উথাল পাথাল মোহিনীদের বসার ঘরের পড়ন্ত বিকেল। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী মোহিনী কবিতার অন্তর্গত দৃশাবলী অনুবাদের সূত্র খোঁজেন উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের পরতে পরতে। শ্রেণীকক্ষে মেধাবী শিক্ষকের কাছে ছক কষে কবিতার ব্যাকরণ শেখা যায়, কিন্তু বসার ঘরে চায়ের আড্ডায় কবিকণ্ঠে কবিতার পাঠ মননে ও মগজে অন্যরকম ঝড় তোলে। মোহিনী ও সুধাময় একই কলেজে আলাদা বিষয়ে স্নাতকের ছাত্র, সময়ের হেরফেরে প্রতিদিন দেখা হয় না। রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র সুধাময়ের ব্যস্ত সময় কাটে মিছিলে-স্লোগানে। সঙ্গত কারণে কলেজে বিশেষ কারো সাথে একান্তে সময় কাটানো হয়ে ওঠে না। দীঘির পাড়, মহাশ্মশান, পৌর উদ্যানে কবিতার রূপকল্প, ছন্দ, উপমার দুরন্ত পাঠ চলে অবিরত। অধ্যাপক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মোহিনীর সুধাময়ের সাথে এই অন্তরঙ্গ বোঝাপড়ার সঠিক নাম বা ব্যাকরণ জানে না দু’জনের কেউই। সুধাময় নিজের কবিতায় দ্বিধা-দ্বন্দ্বের এই সম্পর্ককে শ্রেয়সী নামেই পরিচয় দেয়। স্নাতক শেষ হতে হতে দু’জনের দেখা সাক্ষাতের উপলক্ষও কমতে থাকে। শুরু হয় জীবনের অন্য আয়োজন। বাবা-মায়ের পরিকল্পনাতে হঠাৎ করে অনাড়ম্বরভাবেই বিয়ে হয়ে যায় মোহিনীর। অল্পদিনের ভেতর প্রবাসী স্বামীর সাথে পাড়ি জমায় অস্ট্রেলিয়া। আর পাকাপাকিভাবে কবিতার সাথে বসবাস শুরু হয় সুধাময়ের। এলোমেলো হয়ে যায় রাজনীতি, সমাজ, সংসার, হৃদয়ে সাথে বোঝাপড়ায় ছিন্নভিন্ন হয় বারংবার। মোহিনীর সাথে বিচ্ছেদ শ্রেয়সী হারানোর ব্যাথার চেয়েও বেশীকিছু মনে হয় সুধাময়ের। মধ্যবিত্ত সংসারের বড় সন্তান সুধাময়ের এ বিলাসিতা বেশি দিন চলবে কেন? অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইংরেজি ভাষা শিখতে হয় রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র সুধাময়কে। বাবার পেনশনের টাকায় উচ্চ শিক্ষার নামে মূলত সংসারের ভাগ্য ফেরাতে বিলেতে পাড়ি দিতে হয় সুধাময়কে। বন্ধুর বিনামূল্যের আশ্রয় মাত্র ছয় দিনেই শেষ হয়। বিলেতের মোহ ভাঙ্গে যায় সুধাময়ের। শুরু হয় অন্য আলোর খোঁজ। সরকারি চাকুরে বাবার আশ্রয়ে থেকে বিকেলে চায়ের আড্ডায় সমাজ বদলের স্বপ্নদেখা সুধাময়ের কাছে এ এক অন্য জীবনের প্রতিচ্ছবি। বিদ্যার জোর কোন কাজেই আসে না, পায়ের জোরে দেশি খাবারের দোকানের প্রচারপত্র বিলি করে কোন কোন দিন দুই চার পাউন্ডের সংস্থান হয়। প্রচারপত্র বিলি করা নতুন বিষয় নয় সুধাময়ের কাছে, কিন্তু সাহেবদের বিলেতি কুকুরের তাড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন। হতাশ সুধাময় অল্প সময়ের মধ্যে বুঝে যান, এ সামান্য আয়ে সংসারের ভাগ্য ফেরাতো দূরের কথা নিজেরই টিকে থাকা অসম্ভব। পরিবারের স্বপ্নে জল ঢেলে ফেরার বিমানে চড়তে বাধ্য হয় সুধাময়। বিমান দেশের মাটি স্পর্শ করার সাথে সাথে শুরু হয় নতুন কবিতার চাষবাস। নিশ্চুপ আড়ালে চলে যায় সুধাময়। বছরের পর বছর স্মৃতি হাতড়ে মালা গাঁথে মোহিনীর প্রতিটি স্পর্শ বকুল। কিছুদিন আগে করোনা মহামারি শুরু হলে, ভয়ানক অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘরে ফিরে সকলে। অন্যদের বন্ধিদশা অনায়েশে খুন করে সুধাময়ের একাগ্র নির্জনতা। এবার ঘর ছাড়ে সুধাময়, পথেপথে খুঁজে ফিরে নির্জনতা। দেখা হয় মৃত্যুর মুখোমুখি অসহায় মানুষের নিদারুন একাকিত্বের সাথে। অন্য অনেককে শুশ্রষার সন্ধান দিতে দিতে মহামারীর কোন অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়,আর ফেরে না সুধাময়।

সুধাময় Read More »